বাংলার নমঃশূদ্র আন্দোলনের উদ্ভব ও বিকাশ ব্যাখ্যা

বাংলার নমঃশূদ্র আন্দোলন

ভূমিকা : উনিশ শতকে ভারতে দলিত সম্প্রদায় যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকার অর্জনের চেষ্টা শুর করেছিল , সেগুলির মধ্যে বাংলার নমঃশূদ্র বা চণ্ডাল বা মতুয়া আন্দোলন ছিল উল্লেখযোগ্য । পূর্ববাংলার খুলনা , যশোহর , ফরিদপুর ও বরিশালের নমঃশূদ্র কৃষিজীবীদের এই আন্দোলন গড়ে উঠেছিল ১৮৭০ – র দশকে এবং ভারতের স্বাধীনতার পরেও তা চলেছিল ।

আন্দোলনের উদ্ভব :

নমশূদ্র আন্দোলনের উদ্ভবের প্রেক্ষাপটে ছিল আর্থসামাজিক , ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক কারণ ।

(১) নমঃশূদ্র আন্দোলনের অর্থনৈতিক কারণ:

ঐতিহাসিক শেখর বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে , নমঃশূদ্র অধ্যুষিত এলাকায় উচ্চবর্ণের হিন্দু ও সৈয়দ মুসলমানদের হাতে জমির উপর একচেটিয়া অধিকার ছিল । অন্যদিকে নমঃশূদ্ররা ছিল প্রান্তিক কৃষিজীবী , ভূমিহীন কৃষক ও মজুর । এই পরিস্থিতিতেই নমঃশূদ্ররা অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য শিক্ষা ও চাকরির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিল ।

(২) সামাজিক বৈষম্য :

নমঃশূদ্র সম্প্রদায়কে সামাজিক দিক থেকে পতিত ও অচ্ছুত বলে মনে করা হত । ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে ফরিদপুর – বাখরগঞ্জ অঞ্চলে একজন বিশিষ্ট নমঃশূদ্র গ্রামীণ নেতার মায়ের শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানে উচ্চবর্ণের হিন্দুরা যোগ দিতে অস্বীকার করলে নমঃশূদ্রদের আন্দোলনের সূচনা হয়হয

(৩) নমঃশূদ্রআন্দোলনের ধর্মপ্রচারকের ভূমিকা:

ধর্মপ্রচারক প্রভু জগবন্ধু ও হরিচঁাদ ঠাকুর নমঃশূদ্র সম্প্রদায়কে উদার মানবতাবাদী ধর্মীয় ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ করেন । হরিচঁাদ ঠাকুর তাঁর শিষ্যদের ‘ মতুয়া ’ নামে ডাকতেন । তিনি ব্রাহ্মণ জমিদার ও পুরোহিত শ্রেণির অবিচার ও শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন । নমঃশূদ্রদের মধ্যে আত্মমর্যাদা সৃষ্টি করাই ছিল তাঁর লক্ষ্য । তাই তিনি তাদের মধ্যে শিক্ষা প্রসারে বিশেষ উদ্যোগী হন ।
(৪) পৃথক সংগঠন প্রতিষ্ঠা : নমঃশূদ্ররা ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে নিজেদের জন্য পৃথক সংগঠন গড়ে তোলে । সংগঠনের মুখপত্র ছিল ‘ পতাকা ’ এবং এই পত্রিকায় নমঃশূদ্র নেতা রায়চরণ বিশ্বাস জাতি ব্যবস্থায় নিজেদের ব্রাহ্মণ গোষ্ঠীভুক্ত বলে দাবি করেন ।

(৫) নমঃশূদ্র আন্দোলনের বিকাশ :

বিশ শতকে নমঃশূদ্র আন্দোলনের বিকাশের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলি হল—

( ১ ) প্রতিনিধি দল প্রেরণ :

১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে নমঃশূদ্রদের একটি প্রতিনিধি দল গভর্নরের সঙ্গে দেখা করে এবং ব্রিটিশ শাসনের প্রতি আস্থা প্রদর্শন করে তার স্থায়িত্ব কামনা করে । তাদের যুক্তি ছিল যে , ব্রিটিশ জনগণ কোনোরকম বর্ণভিত্তিক সামাজিক কাঠামোয় বিশ্বাসী নয় । তাই ব্রিটিশরাই তাদের সামাজিক বৈষম্যের হাত থেকে মুক্ত করতে পারবে ।
( ২)  ‘ নমঃশূদ্র ’ নামের স্বীকৃতি :

নমঃশূদ্রদের মধ্যে সামাজিক সংহতির পাশাপাশি সাংস্কৃতিক দিক দিয়েও নমঃশূদ্ররা ঐক্যবদ্ধ হতে সচেষ্ট হয় । হরিচাঁদ ঠাকুরের জন্মতিথি উপলক্ষ্যে প্রতি বছর ঠাকুর নগরে বারুণী মেলা আয়োজিত হয় । গুরুচাঁদ ঠাকুর চণ্ডালদের নাম পরিবর্তন করে নমঃশূদ্র রাখার দাবি জানান । ১৯১১ খ্রিস্টাব্দের জনগণনায় এই দাবি স্বীকৃত হয় । পরবর্তীকালে বাংলার নমঃশূদ্রদের নিয়ে ভিন্ন মাত্রার রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তোলেন যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল।

(৩) সংগঠন স্থাপন :

১৯১২ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ বেঙ্গল নমঃশূদ্র অ্যাসোসিয়েশন ’ । প্রতিটি জেলায় এই সংগঠনের শাখা ছিল এবং এগুলির মাধ্যমে নমঃশূদ্র আন্দোলন পুরোপুরি সংগঠিত আকার নেয় । এর পাশাপাশি নমঃশূদ্ররা উচ্চবর্ণের সংস্কৃতি ( যেমন — নিজেদের ব্রাহ্মণ বলে দাবি , উপবীত ধারণ , এগারো দিন অশৌচ পালন , পরিবারে মহিলাদের বাজারে যাওয়া বন্ধ করা ) অনুসরণ করে সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধিতে সচেষ্ট হয় ।
( ৪ ) সাম্প্রদায়িক প্রতিনিধিত্ব দাবি :

মন্টেগু – চেমসফোর্ড শাসনসংস্কারের প্রস্তাব ঘোষিত হলে নমঃশূদ্ররা ১৯১৭ ও ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে দুটি সম্মেলনের মাধ্যমে ‘ সাম্প্রদায়িক প্রতিনিধিত্বের ’ দাবি করে । এর ফলে ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের মন্টেগু – চেমসফোর্ড সংস্কারে বঙ্গীয় প্রাদেশিক আইনসভায় অনুন্নত শ্রেণির একজন প্রতিনিধি মনোনয়নের নীতি স্বীকৃত হয় ।

পর্যালোচনা :

১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের সংস্কার আইনে নমঃশূদ্রদের দাবি পূরণ না হওয়ায় তারা ক্রমশই ব্রিটিশ সরকারপন্থী হয়ে দাবিপূরণে অগ্রসর হয় । তারা ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দের সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা নীতিকে সমর্থন করে । অন্যদিকে তারা জাতীয় আন্দোলনের বিরোধিতা করে , কারণ তাঁদের মতে , জাতীয় আন্দোলন ছিল উঁচুজাতের হিন্দু ভদ্রলোকদের আন্দোলন ।বাংলায় নমঃশূদ্র আন্দোলনের উদ্ভব ও বিকাশ ব্যাখ্যা

Leave a Comment