ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের শেষ পর্বের ( ১৯৪২-৪৭ খ্রি . ) বর্ণনা করাে | ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম

 ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস

 সূচনা : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ভারতের জাতীয় আন্দোলনে নতুন গতিবেগ আসে । ভারত ছাড়াে আন্দোলন , আজাদ হিন্দ ফৌজের অভিযান , ১৯৪৬ – এর নৌবিদ্রোহ , সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ ইত্যাদি ঘটনাবলি ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে এক অস্থির পরিস্থিতি তৈরি করে । ব্রিটিশ সরকার উপলব্ধি করে যে ভারতে ঔপনিবেশিক শাসন টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয় ।

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের শেষ পর্যায়

 

 1. ক্রিপস্ মিশন : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান যােগ দিলে জাপান কর্তৃক ভারত আক্রমণের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায় । ভারতবাসীর সমর্থন ও সহযােগিতা ছাড়া ইংরেজের পক্ষে জাপানের আক্রমণ প্রতিহত করা সম্ভব ছিল না । তাই ভারতীয় নেতাদের সঙ্গে আলােচনার জন্য ব্রিটিশ মন্ত্রীসভার সদস্য স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রিপসকে ভারতে পাঠানাে হয় ( মার্চ , ১৯৪২ খ্রি . )

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ছবি
চক্রবর্তী রাজা গোপালাচারী

কিন্তু ক্রিপস্ মিশন ভারতের রাজনৈতিক চক্রবর্তী রাজাগােপালাচারী দলগুলিকে সন্তুষ্ট করতে ব্যর্থ হয় । জাতীয় কংগ্রেস ও মুসলিম লিগ উভয়েই ক্রিপস্ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ।

 

2. ভারত ছাড়াে আন্দোলন

‘ ক্রিপস্ মিশন ব্যর্থ হলে ভারতবাসীর মনে হতাশা ও চাপা উত্তেজনা সৃষ্টি হয় । দেশবাসীর অনুভূতিকে গুরুত্ব দিয়ে জাতীয় কংগ্রেস ইংরেজকে ভারত ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য চাপ দেয় । এই লক্ষ্যে ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে ভারত ছাড়াে আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয় । সরকার জাতীয় নেতাদের গ্রেফতার করে আন্দোলনকে ব্যর্থ করার চেষ্টা করে।

 

3. সি . আর . ফর্মুলা

১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে লিগের লাহাের অধিবেশনে মুসলমানদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব গৃহীতসাধারণ নির্বাচন আসন্ন হলে ব্রিটিশ সরকারও ভারতের রাজনৈতিক অচলাবস্থার সমাধান খুঁজতে তৎপর হয় । এই অবস্থায় ভারতের বডােলাট লর্ড ওয়াভেল ব্রিটিশ মন্ত্রীসভার সঙ্গে আলােচনা করেহয়েছিল । মহম্মদ আলি জিন্না ক্রিপস প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে পৃথক পাকিস্তানের দাবিতে অনড় থাকেন । এই সংকট মােচনের উদ্দেশ্যে চক্রবর্তী রাজাগােপালাচারী একটা সমাধানসূত্র দেন ( ১৯৪৪ খ্রি . ) । এতে বলা হয় যে , লিগ কংগ্রেসের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি মেনে নিক এবং জাতীয় সরকার গঠনে কংগ্রেসের সঙ্গে হাত মেলাক । স্বাধীনতার পর গণভােটের মাধ্যমে পৃথক রাষ্ট্র গঠনের বিষয়টি বিবেচিত হবে বলে তিনি প্রস্তাব রাখেন । এটি সি . আর . ফর্মুলা নামে খ্যাত । জিন্না এই প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেন ।

 

 4. ওয়াভেল পরিকল্পনা

ইউরােপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসানের পরেও এশিয়ায় যুদ্ধ চলতে থাকে । এদিকে ব্রিটেনেএকটি সমাধানসূত্র প্রকাশ করেন ( ১৯৪৫ খ্রি . ) । এটি ওয়াভেল পরিকল্পনা নামে খ্যাত । লর্ড ওয়াভেল ঘােষণা করেন যে , শীঘ্রই ভারতের সংবিধান রচনার জন্য ভারতের রাজনৈতিক দলসমূহ ওরাজন্যবর্গের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি ‘ গণপরিষদ গঠন করা হবে ।

 

  5. সিমলা বৈঠক

ওয়াভেল পরিকল্পনা বিষয়ে আলােচনার জন্য সিমলাতে এক সর্বদলীয় বৈঠক আহ্বান করা হয় ( ১৯৪৫ খ্রি . ) । সেখানে জিন্না দাবি করেন যে , বড়লাটের শাসন পরিষদে কেবল লিগ মনােনীত মুসলিম সদস্যদেরই নিতে হবে । কিন্তু জাতীয় কংগ্রেসের মধ্যেও বহু মুসলিম সদস্য ছিলেন । স্বভাবতই জিন্নার দাবি কংগ্রেস মানতে অস্বীকার করে । ফলে সিমলা বৈঠক ভেস্তে যায় ।

 

  6. নৌবিদ্রোহ

গণপরিষদ গঠনের যখন উদ্যোগ চলছে সেই সময় ঐতিহাসিক লালকেল্লায় আজাদ হিন্দ ফৌজের সদস্যদের বিচার শুরু হয় । এর প্রভাব পড়ে নৌবাহিনীতে । ভারতীয় নাবিকদের প্রতি শ্বেতাঙ্গ সরকারের বৈষম্যমূলক আচরণের প্রতিবাদে এবং চাকরির শর্তাবলির উন্নয়নের দাবিতে বােম্বাই বন্দরে তলােয়ার জাহাজে নৌবিদ্রোহের সূচনা হয় । নৌবিদ্রোহ স্বাধীনতা লাভকে ত্বরান্বিত করে ।

 

 7. মন্ত্রী মিশন | মন্ত্রী মিশন কবে ভারতে আসে

১৯৪৫ – এর নির্বাচনে ব্রিটেনে শ্রমিকদল বিজয়ী হয় । নতুন প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট এটলি ভারতীয়দের দাবির প্রতি সহানুভূতি জ্ঞাপন করেন । দেশব্যাপী বিক্ষোভ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ব্রিটেনের শ্রমিক সরকার ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া আলােচনার জন্য ভারতে মন্ত্রী মিশন ’ পাঠানাের সিদ্ধান্ত নেয় । ব্রিটিশ মন্ত্রীসভার তিনজন সদস্য পেথিক লরেন্স , স্ট্যাফোর্ড ক্রিপস্ এবং এ . ভি . আলেকজান্ডার এই উদ্দেশ্যে ভারতে উপস্থিত হন ( মার্চ , ১৯৪৬ খ্রি . )।

 

 ৪. অন্তর্বর্তী সরকার গঠন

১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের নির্বাচনে কংগ্রেস বিপুল ভােটে বিজয়ী হলে জওহরলাল নেহরুর নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয় ( ২ সেপ্টেম্বর , ১৯৪৬ খ্রি . ) । ক্ষুদ্ধ জিন্না এই প্রেক্ষিতে প্রত্যক্ষ সংগ্রামের ডাক দেন । লিগের মদতে ১৬ আগস্ট প্রত্যক্ষ সংগ্রামের নামে কলকাতায় শুরু হয় ভয়াবহ । দাঙ্গাহাঙ্গামা।

 

 9. এটলির ঘােষণা

১৯৪৭ – এর ২০ ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এটলি ঘােষণা করেন যে , ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসের মধ্যেই ব্রিটিশ সরকার ভারতীয়দের হাতে শাসনদায়িত্ব অর্পণ করে ভারত ছেড়ে চলে যাবে । ক্ষমতা হস্তান্তরের কাজ সম্পন্ন করার । উদ্দেশ্যে লর্ড মাউন্টব্যাটেন ভাইসরয় হিসেবে ভারতে আসেন ।

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ছবি

 

10. মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনা

ভারতের সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতির গভীরতা বিচার করে মাউন্টব্যাটেন ভারত বিভাগের আবশ্যিকতা অনুধাবন করেন । উভয় দলের সম্মতিক্রমে তিনি ভারত বিভাগের ও ক্ষমতা হস্তান্তরের নির্ঘণ্ট প্রকাশ করেন ( জুন , ১৯৪৭ খ্রি . ) ।  

 

উপসংহার : ১৯৪৭ – এর জুলাই মাসে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ভারতীয় স্বাধীনতা আইন পাস করা হয় । এই আইনের ভিত্তিতে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ও ১৫ আগস্ট ক্ষমতা হস্তান্তর সম্পন্ন করা হয় । দুটি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্ররূপে পাকিস্তান ও ভারত আত্মপ্রকাশ করে।

টেলিগ্রাম এ জয়েন করুন
Share on:

4 thoughts on “ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের শেষ পর্বের ( ১৯৪২-৪৭ খ্রি . ) বর্ণনা করাে | ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম”

  1. সাফল্যের সূত্র পাওয়া যায়. এটি সম্পর্কে আরও জানুন.

    Reply
  2. অর্থ উপার্জনের সবচেয়ে সহজ উপায় সম্পর্কে সন্ধান করুন.

    Reply

Leave a Comment