স্বাধীনতা পরবর্তী ভারতে সংসদীয় গণতন্ত্র কীভাবে বিকশিত হয়েছে ?

Join Telegram

 

 সূচনা : ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ আগস্ট থেকে স্বাধীন ভারতের পথ চলা শুরু হয় । স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে বলেন , আমাদের প্রধান কাজ কেবল ভারতের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয় , আরও বড়াে কাজ হল ভারতবাসীর আবেগ ও মননশীলতার সংহতি বিধান করা । তাই ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রের বিকাশের জন্য নিম্নলিখিত কর্মসূচি গৃহীত হয় ।

 

The Indian Flug


ভারতে সংসদীয় গণতন্ত্রের বিকাশ 

1. জাতীয় সংহতি সুদৃঢ়করণ : জাতি , ভাষা , ধর্ম ও আচার আচরণগত বৈচিত্র্যকে বিবেচনার মধ্যে রেখেই নেহরু ভারতের জাতীয় সংহতি সুদৃঢ় করার কথা বলেন । তিনি লেখেন , বৈচিত্র্য ও বিভিন্নতা ভারতের জাতীয় সংহতির পরিপন্থী নয় , উপরন্তু এই বৈচিত্র্যই ভারতের প্রাণশক্তির ভিত্তি । তাই সব ভাষা , ধর্ম বা জাতির স্বাতন্ত্রকে অক্ষুন্ন রেখেই তিনি জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় করার কর্মসূচি গ্রহণের ওপর জোর দেন । 

 2. যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামাে গঠন : ভারতে জাতীয় সংহতি বিধানের ক্ষেত্রে সংসদীয় গণতন্ত্রের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ । ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে যে সংবিধান গৃহীত হয় , তা ভারতের চিরাচরিত বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের পথ দেখায় । এখানে যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনকাঠামাে গ্রহণ করা হয় । শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকার গঠনের পাশাপাশি অঙ্গরাজ্যগুলির স্বশাসনের অধিকার সুনিশ্চিত করার ব্যবস্থা হয় । 

 3. সংসদীয় ব্যবস্থার প্রবর্তন : দেশের মৌলিক ও চূড়ান্ত ক্ষমতা ( basic and ultimate power ) পার্লামেন্ট বা সংসদের হাতেন্যস্ত করা হয়েছে । এখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাদের মতামত স্বাধীনভাবে প্রকাশ করতে এবং একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে । অশােক মেহতা বলেছেন যে , “ ভারতের পার্লামেন্ট জাতীয় ঐক্য রক্ষাকারীর ভূমিকা পালন করেছে । 

4. বহুদলীয় ব্যবস্থা : রাজনৈতিক দলসমূহ এবং তাদের কর্মসূচি ভারতে সংসদীয় শাসনধারার এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান । সােশ্যালিস্ট পার্টি , কমিউনিস্ট পার্টি , জনসংঘ , স্বতন্ত্র দল এবং সর্বোপরি জাতীয় কংগ্রেস সবগুলিই ছিল সর্বভারতীয় দল এবং প্রত্যেকের দর্শন ও আদর্শ ছিল ভারতের ঐক্য , সংহতি ও প্রগতি । নীতির ভিত্তিতে গঠিত বহুদলীয় ব্যবস্থা ভারতে গণতন্ত্রের ভিত্তি দৃঢ় করেছে ।  

5. সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠা : স্বাধীনতা – পরবর্তী ভারতের অন্যতম জাতীয় বৈশিষ্ট্য হল সামাজিক ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও সম্প্রসারণ । ভারতের সংবিধানে জাতি , ধর্ম বা লিঙ্গের বৈষম্য অস্বীকার করা হয়েছে । সমাজের অবহেলিত , পশ্চাৎপদ ও শােষিত মানুষের নিরাপত্তা , উন্নয়ন ও মর্যাদা বৃদ্ধি করার অঙ্গীকার সংবিধানে উল্লেখ করা হয় । এই লক্ষ্যে তপশিলি জাতি ও তপশিলি উপজাতিদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান , চাকুরি , নির্বাচন ইত্যাদি ক্ষেত্রে সংরক্ষণ নীতি ’ ( Reservation ) চালু করা হয় । 

6 : সামাজিক সংস্কারসাধন : সমাজের উন্নতিকল্পে সংস্কারমূলক ও কল্যাণমূলক আইন জারি করা হয় । জমিদারি প্রথার অবসান ঘটানাে হয় এবং উদ্বৃত্ত জমি ভূমিহীন মানুষদের মধ্যে বণ্টন করা হয় । অস্পৃশ্যতাকে একটি সামাজিক অপরাধ বলে ঘােষণা করা হয় এবং আইনগতভাবে নিষিদ্ধ করা হয় । ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিকে কার্যকর ও সক্রিয় রাখার ব্যবস্থা গৃহীত হয় ।

7. দেশীয় রাজ্যসমূহের অন্তর্ভুক্তি : স্বাধীনতা লাভের মুহূর্তে ভারত সরকারের সামনে একটি বড়াে কাজ ছিল স্বাধীন দেশীয় রাজ্যগুলিকে ভারতের সঙ্গে যুক্ত করা । এই কাজের জন্য রাজ্য মন্ত্রীদপ্তর ’ ( States Ministry ) গঠন করা হয় এবং এই দপ্তরের দায়িত্ব পান সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল । সর্দার প্যাটেলের দৃঢ়তা এবং নেহরুর নেতৃত্বে ১৯৪৭ – এর ১৫ আগস্টের মধ্যে জুনাগড় , হায়দ্রাবাদ ও কাশ্মীর ছাড়া সমস্ত রাজ্য ভারতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় । ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে জুনাগড় , নভেম্বর মাসে হায়দ্রাবাদ ভারতের সঙ্গে যুক্ত হয় । পরে সংঘর্ষের মধ্যে দিয়ে কাশ্মীরের ভারতভুক্তি ঘটে ।নামক দুটি রাজ্য গড়া হয় । রজনী কোঠারি , বিপান চন্দ্র প্রমুখের মতে , ভাষাভিত্তিক রাজ্য পুনর্গঠনের ফলে ভারতের জাতীয় সংহতি সুদৃঢ় হয় ।

8. ভাষাভিত্তিক রাজ্য পুনর্গঠন : স্বাধীন ভারতে রাজ্যগুলির পুনর্গঠনের প্রশ্নটি বিবেচনার জন্য ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে একটি কমিশন নিয়ােগ করা হয় । বিচারপতি ফজল আলি , কে , এম , পানিক্কর এবং হৃদয়নাথ কুরু এই কমিশনের সদস্য মনােনীত হন । ১৯৫৫ – এর অক্টোবরে কমিশনের রিপাের্ট পেশ করা হয় । ১৯৫৬ – তে রাজ্য পুনর্গঠন আইন জারি হয় । এই আইন অনুযায়ী 0 হায়দ্রাবাদের তেলেঙ্গানা যুক্ত হয় অন্ত্রের সঙ্গে । 2 মালাবার জেলা ও ত্রিবাঙ্কুর – কোচিন যুক্ত করে কেরালা রাজ্য সৃষ্টি করা হয় । ও ১৯৬০ সালে বােম্বাইকে বিভক্ত করে গুজরাত রাজ্য সৃষ্টি করা হয় । ১৯৬৬ সালে পাঞ্জাবকে বিভক্ত করে পাঞ্জাব ও হরিয়ানা

9. সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা : স্বাধীন ভারত সরকারের ঘঘাষিত লক্ষ্য হল সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের সমাজব্যবস্থা প্রবর্তন করা । এই প্রস্তাব ভারতে কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের ধারণা ব্যক্ত করে । এই লক্ষ্যে পৌঁছােনাের জন্য নানা জনমুখী পরিকল্পনা রূপায়ণে জোর দেওয়া হয় । 

 10 , পরিকল্পনা কমিশন : ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে এই কমিশন গঠিত হয় । এর কাজ হল জাতীয় সম্পদ পরিমাপ করা , অর্থনৈতিক পরিকল্পনা রচনা করা , অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ও সুষ্ঠু বণ্টনের মাধ্যমে ওই সম্পদ ব্যবহার করা ইত্যাদি । ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে পরিকল্পনা কমিশনের পুনর্গঠন করা হয় । প্রধানমন্ত্রী এই কমিশনের নেতৃত্ব দেন । রাজ্যগুলিতে পরিকল্পনা – বিষয়ক পরামর্শদাতারা এঁদের কাছে স্থানীয় = উন্নয়নের সমস্যা ও সমাধান সম্পর্কে সুপারিশ পাঠান । রাজ্য ও জেলাস্তরেও পরিকল্পনা সংস্থা গঠন করা হয় । 

 11 , জাতীয় উন্নয়ন পর্ষদ : ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে জাতীয় উন্নয়ন এ । পর্ষদ গঠিত হয় । এর সভাপতি হন প্রধানমন্ত্রী । রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীগণ ও পরিকল্পনা কমিশনের সব সদস্য এর অন্তর্ভুক্ত । এর কাজ হল জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত সামাজিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিচারবিবেচনা করা । এর পদমর্যাদা প্রায় সুপার ক্যাবিনেট ’ পর্যায়ের । এটি ভারত সরকার ও সব রাজ্য সরকারের পক্ষে কার্য পরিচালনা করে । 

 12. সাধারণ নির্বাচন ব্যবস্থার প্রবর্তন : ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে স্বাধীন ভারতে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় । এই নির্বাচনে ত জাতীয় কংগ্রেস বিপুল ভােটে বিজয়ী হয় ও সরকার গঠন করে । ১৯৫৭ ও ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় ও তৃতীয় সাধারণ য় । নির্বাচনেও কংগ্রেস জয়লাভ করে । তবে দ্বিতীয় সাধারণ নির্বাচনে প্রদেশে সর্বপ্রথম অকংগ্রেসি মন্ত্রীসভা গঠিত হয় । ই . এম . এস . নাম্বুদ্রিপাদের নেতৃত্বে কেরলে প্রথম কমিউনিস্ট সরকার গঠিত হয় । 

 উপসংহারঃ

সংসদীয় গণতন্ত্রের বিকাশকে চূড়ান্ত পর্যায়ে উন্নীত করার জন্য শুধুমাত্র সাংবিধানিক সুরক্ষাই যথেষ্ট নয় , এর জন্য দারিদ্র্য মােচন , নির্বাচনে দুর্নীতি রােধ , আর্থিক বৈষম্য হ্রাস , উগ্র প্রাদেশিকতা ও আলিকতাবাদের অবসান ঘটানাে প্রয়ােজন । এ ব্যাপারে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলিকে আন্তরিক উদ্যোগ নিতে হবে। 


Join Telegram
Share on:

Leave a Comment