History of Islam in bangla | খলিফা শব্দের অর্থ কি |সর্বজনীন খলিফাতন্ত্র | খলিফা কিভাবে নির্ধারিত হয়?

Join Telegram

Table Of Contents

History of Islam in bangla

ইসলামের আগে ও পরে আরব দুনিয়া

1. অজ্ঞানতার যুগ: ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে আরব দুনিয়ার ইতিহাসের সময়কালকে ‘অজ্ঞানতার যুগ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই সময় আরবের মানুষ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীতে বিভক্ত ও বিচ্ছিন্ন ছিল। দেশে কোনো সুগঠিত শাসনব্যবস্থা বা আইন শৃঙ্খলার অস্তিত্ব ছিল না। তখন আরবে কোনো ধর্ম প্রচারকের আবির্ভাব হয়নি, কোনো ধর্মগ্রন্থ রচিত হয়নি বা কোনো ধর্মীয় মতবাদও গড়ে ওঠেনি। সামাজিক ও নৈতিক জীবনযাত্রাও ছিল নিম্নমানের। তাই ইতিহাসবিদ পি. কে. হিট্টি বলেছেন যে, এই সময় আরবে আদিম যুগের পরিস্থিতিই বিরাজমান ছিল। 

2. ইসলামি প্রজাতন্ত্র:- পরবর্তীকালে হজরত মহম্মদ (৫৭০-৬৩২ খ্রি.) আরবে ইসলাম ধর্ম প্রবর্তনের মাধ্যমে সেখানকার বহুধা বিচ্ছিন্ন জাতিগোষ্ঠীকে একসূত্রে বাঁধেন। তিনি আরবের মদিনা শহরকে কেন্দ্র করে এক ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি নিজে এই প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপ্রধান হন। হজরত মহম্মদের মৃত্যুর পরবর্তীকালে যারা এই প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচিত হতেন তাদের বলা হত খলিফা (Caliphate)।

 

খলিফা শব্দের অর্থ কি

খলিফা-র অর্থ :- ‘খলিফা’ শব্দের অর্থ হল ‘প্রতিনিধি’। হজরত মহম্মদের মৃত্যুর পরবর্তীকালে তার বিশাল প্রজাতান্ত্রিক সাম্রাজ্যের শাসন পরিচালনার জন্য এমন শাসকের প্রয়োজন ছিল যিনি একদিকে দেশ শাসন করবেন এবং অন্যদিকে ইসলামের আদর্শ, নিয়ম-কানুন ও ধর্মীয় বিধিনিষেধ রক্ষা করবেন। খলিফা হলেন সেই ইসলামীয় শাসক যিনি প্রজাতন্ত্রের শাসক, ইসলামের প্রচারক, ইসলামের ধর্মীয় রীতিনীতির রক্ষক এবং প্রধান বিচারক। অর্থাৎ যাঁরা ইসলামি ব্যবস্থা অনুসারে মহম্মদ প্রতিষ্ঠিত ইসলামি প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শাসন পরিচালনা করেন এবং মহম্মদ প্রবর্তিত ধর্মে সর্বোচ্চ নেতৃত্ব দেন তারাই ‘খলিফা’ নামে পরিচিত।

 

আরবের খলিফাতন্ত্রের সর্বজনীনতা

আরবের খলিফাতন্ত্রের সর্বজনীনতা :- হজরত মহম্মদের মৃত্যুর (৬৩২ খ্রি.) পর মহম্মদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হজরত আবু বকর আরবে খলিফাদের শাসনের প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে খলিফাদের প্রতিটি পর্বের শাসনকালে, বিশেষ করে প্রতিষ্ঠার পরবর্তী ৩০০ বছর মুসলিম দুনিয়ায় খলিফাতন্ত্রের রাষ্ট্রনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক আদর্শের সর্বজনীন সর্বজনীন প্রসার ঘটে। এই প্রসারের ক্ষেত্রে আরবে প্রথম তিনটি পর্বের খলিফাদের শাসনকাল বিশেষ গুরত্বপূর্ণ ছিল। যথা— 

1. খোলাফায়ে রাশেদিন বা পবিত্র খলিফাদের শাসনকাল (৬৩২-৬৬১ খ্রি.),

2. উমাইয়া বংশের খলিফাদের শাসনকাল (৬৬১ ৭৫০ খ্রি.) এবং

 3. আব্বাসীয় বংশের খলিফাদের শাসনকাল (৭৫০-১২৫৮ খ্রি.)। এই খলিফারা বিশ্বের মুসলিম জনগণের উপর সর্বজনীন কর্তৃত্ব স্থাপন করে তাদের ধর্মীয় ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ করতে পেরেছিলেন। রাজনৈতিক অগ্রগতি ও ইসলামের প্রসারের পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও মুসলিম দুনিয়ায় আরবের এই খলিফাদের সর্বজনীন ক্ষমতা ও নেতৃত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। খলিফাদের শাসনপ্রণালীর অনুকরণে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মুসলিম ও শাসকদের শাসন কাঠামোটি গড়ে উঠেছিল এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মুসলিম শাসকদের কাছে আরবের খলিফাদের শাসন একটি আদর্শ কাঠামো হিসেবে গৃহীত হয়েছিল। খলিফাদের আমলে সাংস্কৃতিক ধারাটিও মুসলিম দুনিয়ায় সর্বজনীনভাবে গৃহীত হয়েছিল।

 

1. খোলাফায়ে রাশোদিন-এর আমল

ইসলাম, খিলাফত এবং চার খলিফা

আরবে হজরত আবুবকর ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে খলিফাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠার পরবর্তী প্রথম চারজন খলিফাকে ‘পবিত্র খলিফা’ বা ‘খোলাফায়ে রাশোদিন’ (সত্য ও ন্যায়ের পথিক) বলা হয়। এই চারজন খলিফার নাম ও তাঁদের রাজত্বকাল ছিল নিম্নরূপ— 

খলিফার নাম শাসনকাল (খ্রিস্টাব্দ অনুসারে) শাসনকাল (হিজরি সন অনুসারে)
হজরত আবুবকর 632-634 11-12
হজরত ওমর ফারুক 634-644 13-24
হজরত ওসমান গনি 644-656 24-36
হজরত আলি 656-661 36-41

A. রাজনৈতিক অগ্রগতি ও ইসলামের প্রসার

 

হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাঃ বাণী

 হজরত আবুবকর আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ): 1. মহানুভবতা :- প্রথম খলিফা হজরত আবুবকর ছিলেন আরবের একজন ধনী ব্যবসায়ী, সৎ, সত্যবাদী ও সজ্জন মানুষ। তিনি ইসলামের প্রসারে মহানুভবতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন এবং একাজে তাঁর ব্যাবসার অর্থ অকাতরে ব্যয় করেন। হজরত মহম্মদ একদা নিজেই মন্তব্য করেন যে, “আবুবকরের ধনসম্পদের মতো আর কারও ধনসম্পদ আমাকে এতটা সাহায্য করেনি।” একদা হজরত মহম্মদ তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, “তুমি তো তোমার সবই দান করে দিলে, পরিবারের জন্য কী রেখে এসেছ?উত্তরে আবুবকর জানান “তাদের জন্য আল্লাহ্ ও আল্লাহ্র রসুলকে রেখে এসেছি।” 

2. মুক্তিদাতা :- একদা বিলাল নামে আবিসিনিয়ার এক ক্রীতদাস সদর্পে প্রচার করেন যে, ঈশ্বর এক এবং অদ্বিতীয়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে বিলালের প্রভু তাঁকে আরবের তপ্ত বালিতে শুইয়ে জ্বলন্ত সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকতে বাধ্য করেন। এই কঠোর অত্যাচার সত্ত্বেও বিলাল ‘আহাদ, আহাদ’ (ঈশ্বর এক, ঈশ্বর এক) বলে চিৎকার করেন। এই নির্যাতনের খবর শুনে আবুবকর নিজের অর্থ দিয়ে বিলালকে ক্রয় করে তাঁকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দেন। এরপর আবুবকর মুক্তিদাতা‘ নামে পরিচিত হন।

3 আধিপত্য প্রতিষ্ঠা :- আবুবকর খলিফা পদে বসার পর আরবের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মানুষ ‘জাকাং‘ অর্থাৎ কর দিতে অস্বীকার করে বিদ্রোহ করেন। ফলে দেশের নানা প্রান্তে অশান্তি ছড়ায় এবং বিভিন্ন নতুন ধর্ম প্রচারকের আবির্ভাব ঘটে। এই পরিস্থিতিতে তিনি অন্তত এগারো বার অভিযান চালিয়ে আরবে ইসলামের কর্তৃত্ব সুদৃঢ় করেন। তাঁর সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদ মাত্র ছয় মাসের মধ্যে সমগ্র মধ্য আরবে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। বহু নতুন অঞ্চলেও ইসলাম সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।

 

হযরত ওমর রাঃ এর উপাধি কী ছিল

হজরত ওমর ফারুক :- 1.প্রথম জীবন : প্রথম জীবনে ইসলামের ঘোর বিরোধী হজরত ওমর ফারুক একদা তরবারি নিয়ে হজরত মহম্মদকে হত্যা করতে ছুটে গিয়েছিলেন। কিন্তু কোরানের পবিত্র বাণী শুনে তাঁর মনে পরিবর্তন ঘটে। “আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যস্থলে যা কিছু আছে তা সবই আল্লাহর মহিমা ঘোষণা করে, তিনি সর্বশক্তিমান ও সর্বজ্ঞ”–কোরানের এই বাণী ওমরের হৃদয়তন্ত্রীতে ঝড় তোলে। এরপর তিনি হজরত মহম্মদের কাছে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।

2 বিভিন্ন অভিযান :- খলিফা পদে বসে ওমর ফারুক রাজনৈতিক অগ্রগতি ও ইসলামের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। তাঁর সেনাবাহিনী সিরিয়ার বিভিন্ন শহর এবং জিশুখ্রিস্টের পবিত্র ভূমি জেরুজালেম দখল করে। এ ছাড়া তিনি মিশর, কুর্দিস্তান, আর্মেনিয়া সহ আরও কয়েকটি স্থানে মুসলিম আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন।

 

হজরত ওসমান গনি:- 1. অভিযান : খলিফা ওসমান গনির শাসনকালে ইসলামের জয়যাত্রা অব্যাহত থাকে। তাঁর আমলে বাল্‌খ, হিরাট, কাবুল, গজনী, দক্ষিণ পারস্য ও এশিয়া মাইনরে ইসলামের বিজয় পতাকা উড্ডীন হয়। এরপর আফ্রিকার সিরিয়ায় গোলযোগ শুরু হলে সেখানে পুনরায় আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন এবং সাইপ্রাস দ্বীপে ইসলামের অধিকার স্থাপন করেন।

2. সংস্কার : কিছু ত্রুটিবিচ্যুতি সত্ত্বেও ওসমান গনির চরিত্রে সততা, কর্তব্যপরায়ণতা ও প্রজাহিতৈষণা লক্ষ করা যায়। তিনি বহু রাস্তাঘাটবাগান তৈরি করেন, খাল খনন করেন এবং নিরাপত্তার উদ্দেশ্যে পুলিশি চৌকি স্থাপন করেন। তাঁর মহত্ত্ব প্রকাশ করতে গিয়ে একদা স্বয়ং হজরত মহম্মদ উক্তি করেছিলেন—“আমি স্বর্গের দুয়ারে ওসমানের নাম লেখা দেখেছি। ঈশ্বরের সিংহাসনের পিছনে তাঁর নাম লেখা দেখেছি। আমি তাঁর নাম লেখা দেখেছি সর্বশ্রেষ্ঠ দেবদূত গ্যাব্রিয়েলের ডানার ওপর।”

 

কবে কিভাবে খলিফাদের রাজত্বকাল শেষ হয়

হজরত আলি:- ওসমান গনি নিহত হওয়ার পর চতুর্থ খলিফা হিসেবে হজরত আলির নাম ঘোষিত হলে গৃহযুদ্ধ বেধে যায়। প্রথমদিকে তিনি কিছু সাফল্য পেলেও পরবর্তীকালে সিরিয়ার শাসনকর্তা মুয়াবিয়ার কর্তৃত্ব মেনে। নিতে বাধ্য হন। হজরত আলি ৬৬১ খ্রিস্টাব্দে এক আততায়ীর হাতে নিহত হলে পবিত্র খলিফাদের রাজত্বকাল শেষ হয়।

 

শাসনব্যবস্থা: হজরত ওমর ফারুক প্রবর্তিত শাসন ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগের শাসনব্যবস্থা গড়ে ওঠে।

1. মন্ত্রণা পরিষদ : শাসনকার্য পরিচালনার কাজে সহায়তার জন্য মজলিস-উস-শুরা নামে একটি মন্ত্রণা পরিষদ ছিল। এই পরিষদ শাসনকার্যে খলিফাকে পরামর্শ দিত।

2. নাগরিকদের অধিকার: শাসনকার্য পরিচালনায় নাগরিকদের কিছু আধিকার ছিল। সরকারি কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি গ্রহণ করা হত।

3. রাজস্ব ব্যবস্থা : পবিত্র খলিফাদের রাজত্বের প্রথমদিকে ইসলাম অনুমোদিত জাকাৎ (ধনীদের উপর ধার্য কর), জিজিয়া (অমুসলমানদের উপর ধার্য কর), খারজ (নব্য বিজিত অঞ্চলের অমুসলমানদের উপর ধার্য ভূমিকর), খামস (যুদ্ধের দ্বারা লুণ্ঠিত সম্পদ) ও উসর (মুসলমান ভূম্যাধিকারীদের উপর ধার্য ভূমিকর) নামে পাঁচটি কর আদায় করা হত। এ ছাড়া পরবর্তীকালে আল-ফে (বিজিত রাজা, রাজকুমার ও অভিজাতদের জমির উৎপাদনের উপর ধার্য কর), উশুর (অমুসলমান ব্যবসায়ীদের পণ্যের উপর ধার্য কর) প্রভৃতি নতুন করের প্রচলন ঘটে।

4. বায়তুলমাল : রাষ্ট্র থেকে আদায় করা রাজস্ব জমা রাখার উদ্দেশ্যে ‘বায়তুলমাল‘ নামে একটি সরকারি কোশাগার প্রতিষ্ঠা করা হয়।

5. প্রাদেশিক শাসন: সাম্রাজ্যের আয়তন ক্রমশ বৃদ্ধি পেলে সমগ্র রাষ্ট্রকে বিভিন্ন প্রদেশে বিভক্ত করা হয় এবং প্রতিটি প্রদেশে একজন করে ওয়ালি বা গভর্নর নিযুক্ত হন।

6. বিচারব্যবস্থা : ন্যায় ও সততার ভিত্তিতে খলিফাদের বিচারব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। দেশের সর্বোচ্চ বিচারপতি ছিলেন স্বয়ং খলিফা। তিনি বিচারকার্য পরিচালনার উদ্দেশ্যে প্রতিটি প্রদেশে একজন করে কাজি নিয়োগ করতেন।

7. জনকল্যাণ: খলিফাগণ জনকল্যাণের উদ্দেশ্যে পান্থশালা, কোশাগার, রাস্তাঘাট, সেতু প্রভৃতি। নির্মাণ করতেন।

 

খলিফাদের যুগে সমাজ

C. সমাজ খোলাফায়ে রাশেদিনের আমলে আরবের সমাজজীবন ছিল সরল ও অনাড়ম্বর।

1. অনাড়ম্বর জীবনযাপন: খলিফাগণ খুবই সহজ-সরল, অনাড়ম্বর জীবনযাপন করতেন। তাঁরা খুবই ক্ষুদ্র কুটিরে বাস করতেন। খলিফা হজরত ওমরের একটি মাত্র জামা ছিল এবং তাতে বহু জোড়াতালি ছিল।

2. সমান অধিকার : এই সময় আরবের মুসলিম সমাজে মানুষ সম-অধিকার ও মর্যাদা ভোগ করত। আইনের চোখে খলিফা ও সাধারণ মানুষ সকলেই সমান ছিলেন।

3. সামাজিক শ্রেণি: এযুগে সমাজে তিনটি প্রধান শ্রেণি ছিল। যথা—[i] প্রথম শ্রেণিভুক্ত আনসার, মোহাজের ও বিভিন্ন আরব গোত্রের মুসলমান, [ii] দ্বিতীয় শ্রেণিভুক্ত বিজিত দেশগুলির মুসলমান এবং [iii] তৃতীয় শ্রেণিভুক্ত ইহুদি, খ্রিস্টান, পারসিক প্রভৃতি অমুসলমান।

4. জাঁকজমক: সমাজের ধনী ব্যাক্তিরা জাঁকজমকপূর্ণ জীবনযাপন করতেন।

5. সংগীতচর্চা: আরবের মানুষ সংগীতের যথেষ্ট অনুরাগী ছিল। সংগীত ছিল অবসর বিনোদনের অন্যতম অঙ্গ।

6. দাসপ্রথা এযুগে আরবে দাসপ্রথা প্রচলিত ছিল। তবে এ সময় দাসদের অবস্থার উন্নতি ঘটেছিল। খলিফাগণ দাসদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন এবং এই প্রথা উচ্ছেদেরও চেষ্টা করেছিলেন।

 

খলিফাদের যুগে বা আমলের সংস্কৃতি

D. সংস্কৃতি : স্থাপত্য: খলিফাদের আমলে আরবের সর্বত্র বহু মসজিদ নির্মিত হয়। মসজিদগুলি মুসলমানদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও ‘নামাজের কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

2 শিক্ষা: খোলাফায়ে রাশেদিন-এর আমলে আরবে শিক্ষাব্যবস্থার যথেষ্ট প্রসার ঘটে। খলিফাগণ শিক্ষার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। মসজিদগুলি ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবেও কাজ করত। এ ছাড়া ব্যক্তিগত উদ্যোগে গৃহে শিক্ষাদান চলত। কোরান শরীফের ব্যাখ্যা, আরবি ব্যাকরণ, অঙ্ক, দর্শন প্রভৃতি বিষয়ে চর্চা হত।

 

2. উমাইয়া বংশের আমল (৬১১-৭৫০)

খোলাফায়ে রাশোদিন-এর সর্বশেষ খলিফা হজরত আলি নিহত হওয়ার (৬৬১ খ্রি.) পর তাঁর পুত্র হাসান ছিলেন খলিফা পদের দাবিদার। কিন্তু সিরিয়ার শাসনকর্তা উমাইয়া বংশের সন্তান মুয়াবিয়ার বিরোধিতায় তিনি দাবি ত্যাগ করেন। এরপর মুয়োবিয়া বা মাবিয়া (৬৬১-৬৮০ খ্রি.) খলিফা হন। ফলে আরবে উমাইয়া বংশের খলিফাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হাসানকে হত্যা করতে মুয়াবিয়া হাসানের স্ত্রী জায়েদার সঙ্গে ষড়যন্ত্র করেন। একলক্ষ দিরহাম (মুদ্রা) লাভ ও মুয়াবিয়ার রাজপরিবারে খলিফার পুত্রবধূ হওয়ার প্রস্তাব পেয়ে জায়েদা তাঁর স্বামী হাসানকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করেন। হত্যাকাণ্ডের পর জায়েদাকে একলক্ষ দিরহাম দিয়ে মুয়াবিয়া বলেন, “যে মহিলা তাঁর স্বামীকে হত্যা করে তাঁকে আমার পুত্রবধূ করতে পারি না।”

 

A. রাজনৈতিক অগ্রগতি ও ইসলামের প্রসার

সাম্রাজ্য ও ইসলামের প্রসারে মুয়াবিয়া তাঁর পুত্র ইয়াজিদ ও উমাইয়া বংশের পরবর্তী খলিফাগণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেন।

1. মুয়াবিয়া : মুয়াবিয়ার আমলে পূর্ব ও পশ্চিম উভয় দিকেই ইসলামের প্রসার ঘটে। তিনি পশ্চিমদিকে উত্তর আফ্রিকা দখল করে আরও সামনের দিকে অগ্রসর হয়ে আটলান্টিক মহাসাগরের তীরে উপনীত হন। সমুদ্রের বিশাল জলরাশি তাঁর অগ্রগতি রোধ করলে তিনি আক্ষেপ করে বলেন যে, “হে আল্লাহ্! যদি এই বিশাল সমুদ্র আমার অন্তরায় না হত, তাহলে আমি আরও দেশ জয় করতাম এবং তোমার ধর্ম ও নামের মহিমা প্রচার করতাম।” মুয়াবিয়ার সেনাদল পূর্বদিকে কাবুল, কান্দাহার, সমরখন্দ, গজনী, মাকরান, সিন্ধুর নিকটবর্তী অঞ্চল প্রভৃতি দখল করে।

2. ইয়াজিদ: ইয়াজিদ (৬৮০-৬৮৩ খ্রি.) খলিফা পদে বসলে হোসেনের সঙ্গে তাঁর সংঘর্ষ শুরু হয়। সংঘর্ষে বীরবিক্রমে যুদ্ধ করেও দুই শিশুপুত্রসহ হোসেন কারবালার মাঠে মৃত্যুবরণ (৬৮০ খ্রি.) করেন। এই মৃত্যুদিনটি মুসলিম ধর্মাবলম্বীরা মহরম হিসেবে পালন করেন। ইয়াজিদের আমলেও ইসলামের প্রসার অব্যাহত থাকে।

3. পরবর্তী খলিফাগণ : ইয়াজিদের পরবর্তী খলিফাদের আমলেও খলিফা সাম্রাজ্য ও ইসলামের প্রসার অব্যাহত থাকে। এই পর্বের প্রসারে বিশেষ কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন আবদুল মালিক, প্রথম আল-ওয়ালিদ, সুলেমান প্রমুখ। উমাইয়া বংশের শাসনের শেষদিকে তাদের সাম্রাজ্যের সীমানা ফ্রান্সের দক্ষিণ অংশ পোর্তুগাল ও স্পেন-সহ ভূমধ্যসাগরের বিভিন্ন দ্বীপ, আফ্রিকার পশ্চিমে জিব্রাল্টার প্রণালী থেকে পূর্বে সুয়েজ খাল এবং এশিয়ার সিনাই মরুভূমি থেকে পূর্বে মঙ্গোলিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।

 

B. শাসনব্যবস্থা: 1. বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্র মুয়াবিয়া খলিফা পদে বসে তাঁর পুত্র ইয়াজিদকে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী মনোনয়নের মাধ্যমে বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্রের সূচনা করেন। এজন্য ঐতিহাসিক মুরে বলেছেন, “মুয়াবিয়ার দামাস্কাসের সিংহাসনে আরোহণ খিলাফতের সমাপ্তি এবং রাজতন্ত্রের সূচনা করে।” এই রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার শীর্ষে অবস্থান করতেন স্বয়ং খলিফা। শাসনব্যবস্থায় প্রতিনিধিত্বের কোনো সুযোগ ছিল না। 

2. কেন্দ্রীয় শাসন:- কেন্দ্রীয় শাসন পরিচালনার উদ্দেশ্যে প্রশাসনকে পাঁচটি অংশে বিভক্ত করা হয়। প্রতিটি বিভাগ পৃথক পৃথক দায়িত্ব পালন করত। কেন্দ্রের রাজস্ব বিভাগ রাষ্ট্রের আয়ব্যয়ের হিসাব রাখত।

3. প্রাদেশিক শাসন: উমাইয়া যুগে সাম্রাজ্যকে বিভিন্ন প্রদেশে বিভক্ত করা হত। খলিফা কর্তৃক নিযুক্ত ওয়ালী বা গভর্নর ছিলেন প্রধান শাসনকর্তা। তাঁর প্রধান কাজ ছিল প্রদেশের শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা, বিদ্রোহ দমন ও আইন ভঙ্গকারীকে শাস্তিদান।

4. ডাকব্যবস্থা: এযুগে আরবে ডাক ব্যবস্থার প্রচলন ঘটে। ঘোড়া বা উটের দ্বারা প্রথমে শুধু সরকারি কাজে এবং পরে সাধারণ মানুষের কাজে এই ডাকব্যবস্থা ব্যবহার করা হত।

5. বায়তুলমাল: এযুগে বায়তুলমাল বা সরকারি কোশাগারের সম্পত্তি খলিফাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হয়।

6. রাজস্ব ব্যবস্থা: এযুগে প্রধান রাজস্বগুলি ছিল— [i] খারজ, [ii] জিজিয়া, [iii] জাকাৎ, [iv] বাণিজ্য শুল্ক, [v] করদ রাজ্য থেকে প্রাপ্ত কর, [vi] যুদ্ধ থেকে প্রাপ্ত সম্পদের ১/৫ অংশ, [vii] উৎসব উপলক্ষে কর, [viii] আল-ফে প্রভৃতি।

 

সমাজ ব্যবস্থা

C. সমাজ: 1. ভোগবিলাস উমাইয়া খলিফাদের শাসন কালে খলিফাদের সামাজিক জীবনে ভোগবিলাস ও আড়ম্বর বৃদ্ধি পেয়েছিল। বহু খলিফার আমলে মদ্যপান, উপপত্নী রাখা, নর্তকীর সঙ্গলাভ প্রভৃতি প্রচলিত ছিল।

2. সামাজিক শ্রেণিবিভাগ: এযুগে সমাজে প্রধানত চারটি শ্রেণির অস্তিত্ব ছিল। যথা— [i] অভিজাত: অভিজাত সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল খলিফার পরিবারবর্গ, উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী প্রভৃতি আরবীয় মুসলমানগণ। [ii] মাওয়ালি: নবদীক্ষিত মুসলমানরা মাওয়ালি সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল। [iii] জিম্মি: ইহুদি, খ্রিস্টান, পারসিক ও অন্যান্য অমুসলমানরা এই সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তারা জিজিয়া কর দিয়ে মুসলিম রাষ্ট্রে নিরাপত্তা লাভ করত। [iv] দাস: দাস ছিল সমাজের সর্বনিম্ন সম্প্রদায়। প্রধানত যুদ্ধবন্দিরা দাসে পরিণত হত। দাস ক্রয়বিক্রয় এযুগে একটি লাভজনক ব্যাবসা হিসেবে অত্মপ্রকাশ করেছিল।

3. নারীর অবস্থা  সমাজে পর্দাপ্রথার প্রচলন থাকলেও এযুগে নারীদের যথেষ্ট মর্যাদা ও স্বাধীনতা ছিল। অনেক নারী জ্ঞান, কাব্য ও সৌন্দর্য চর্চা করত। 4. পোশাক: এযুগে খলিফাগণ নামাজে যোগ দেওয়ার সময় বিশেষ ধরনের সাদা পোশাক পরতেন। সাধারণ মানুষ এযুগে সুদৃশ্য ও জাঁকজমক পোশাক পরত। বোরখা প্রথার প্রচলনও ছিল। 

 

D, সংস্কৃতি: উমাইয়া বংশের আমলে সংস্কৃতির বিভিন্ন শাখায় যথেষ্ট অগ্রগতি ঘটে।

1. শিক্ষা ও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা: উমাইয়া বংশের খলিফাগণ শিক্ষা ও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। বহু মূল্যবান গ্রন্থ আরবি ভাষায় অনুদিত হয়েছিল।

2. কাব্যচর্চা: এযুগে কাব্যচর্চারও অগ্রগতি ঘটে। ইবন আবু রাবিয়া, জামিল, জারির, ফরাজদাক, আখতাল প্রমুখ কবি জন্মগ্রহণ করেন। লায়লা-মজনুর স্বর্গীয় প্রেমকাহিনি-বিষয়ক গীতিকবিতা এযুগেই রচিত হয়।

3. ইসলামি সভ্যতার কেন্দ্র: এ যুগে মক্কা, মদিনা, বসরা, কুফা, দামাস্কাস প্রভৃতি শহর ইসলামি সভ্যতা ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। মুসলিম দুনিয়ায় গুরুত্বের বিচারে প্রথমে মক্কা এবং তারপরই মদিনা স্থানলাভ করে।

4. বিজ্ঞানচর্চা : এযুগে করে। জ্যোতির্বিদ্যা, চিকিৎসা, রসায়নশাস্ত্র প্রভৃতি বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় যথেষ্ট অগ্রগতি ঘটে।

5. সংগীত: সংগীত চর্চা উমাইয়া শাসনকালে যথেষ্ট জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। খলিফাগণ বিভিন্ন সংগীতশিল্পীর পৃষ্ঠপোষকতা করেন। সমাজ, ধর্ম, প্রেম ভালোবাসা নিয়ে বহু গান রচিত হয়।

6. স্থাপত্য : উমাইয়া খলিফাদের পৃষ্ঠপোষকতায় স্থাপত্যশিল্পের যথেষ্ট অগ্রগতি ঘটে। মসজিদে মিনার নির্মাণ শুরু হয়। জেরুজালেমের ‘কুব্বাতুল সাখরা’ মসজিদ, দামাস্কাসে উমাইয়া মসজিদ, বিভিন্ন স্মৃতিস্তম্ভ প্রভৃতি এযুগের স্থাপত্যশিল্পের উল্লেখযোগ্য নিদর্শন।

মসজিদুল আকসা প্যালেস্তাইন
উমাইয়া খলিফাদের আমলে নির্মিত গম্বুজ

 

3. আব্বাসীয় বংশের আমল

উমাইয়া বংশের পতনের (৭৫০ খ্রি.) পর আবুল আব্বাস (৭৫০-৭৫৪ খ্রি.) খলিফা পদে বসে আরবে আব্বাসীয় বংশের শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। ইসলাম, শাসন, সমাজ, সংস্কৃতি প্রভৃতি বিভিন্ন ক্ষেত্রে আব্বাসীয় শাসনকালে যথেষ্ট অগ্রগতি ঘটে।

 

A. রাজনৈতিক অগ্রগতি ও ইসলামের প্রসার

1. আবু জাফর আল-মনসুর: আব্বাসীয় বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা আবু জাফর আল-মনসুরের আমলে (৭৫৪ ৭৭৫ খ্রি.) সাম্রাজ্য ও ইসলামের প্রকৃত প্রসার শুরু হয়। তিনি বিভিন্ন স্থানের বিদ্রোহ দমন করেন এবং তাবারিস্তান, গিলান, দায়লাম ও এশিয়া মাইনরের বিভিন্ন অঞ্চল নিজ সাম্রাজ্যভুক্ত করেন।

2 হারুন-অল-রসিদ : আব্বাসীয় বংশের শ্রেষ্ঠ খলিফা ও আরব্য উপন্যাসের মহানায়ক হারুন-আল-রসিদের (৭৮৬-৮০৯ খ্রি.) আমলে খিলাফতের গৌরব সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছোয়। তিনি বাইজানটাইন সাম্রাজ্যের হিরাক্লিয়া ও টিরানা দখল করেন এবং বাগদাদ নগরীর মর্যাদা সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে দেন। তিনি একদা গর্ব করে সূর্যকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “হে সূর্য, যেথা খুশি আলো ছড়িয়ে দাও। কিন্তু তা যেন কখনোই আমার সাম্রাজ্যের বাইরে না হয়।

3 পরবর্তী খলিফাদের আমল: হারুন-আল-রসিদের পরবর্তী খলিফাদের আমলে সাম্রাজ্য ও ইসলামের প্রসার বহুলাংশে ব্যাহত হলেও তা কখনোই একেবারে থেমে থাকেনি। তারা বিভিন্ন ক্রুসেডেও সাফল্যের পরিচয় দিয়েছেন।

 

B. শাসনব্যবস্থা: 1. খলিফার একাধিপত্য : আব্বাসীয় শাসনে খলিফার সর্বময় কর্তৃত্ব স্থাপিত হয়েছিল। তাঁরা ছিলেন একাধারে সর্বোচ্চ শাসক এবং মুসলিম সমাজের ধর্মীয় নেতা।

2. কেন্দ্রীয় শাসন: কেন্দ্রীয় শাসন পরিচালনার উদ্দেশ্যে খলিফাগণ বিভিন্ন দপ্তর প্রতিষ্ঠা করেন। এগুলি বিভিন্ন বিভাগের কাজ দেখাশোনা করত।

3 রাজস্বব্যবস্থা : আব্বাসীয় শাসনকালে ভূমিকর, আয়কর, জিজিয়া, জাকাৎ, আমদানি কর, বাণিজ্য শুল্ক, লবণ কর প্রভৃতি আদায় করা হত।

4. বিচার ব্যবস্থা : আব্বাসীয় বিচার ব্যবস্থায় সাম্য ও নিরপেক্ষ নীতির উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। কাজি বিচারবিভাগ পরিচালনা করতেন। তাঁকে সহায়তা করতেন ‘আদল’ নামে কর্মচারী।

5. প্রাদেশিক শাসন: সাম্রাজ্যকে বিভিন্ন প্রদেশে ভাগ করে প্রতিটি প্রদেশের শাসনভার ‘আমীর’ নামে উচ্চপদস্থ কর্মচারীর হাতে ন্যস্ত হয়েছিল। খলিফার দ্বারা নিযুক্ত এই আমীরগণ তাদের কাজের জন্য খলিফার কাছে দায়বদ্ধ থাকতেন।

 

আব্বাসীয় সমাজ

C. সমাজ: 1. আভিজাত্যের অবসান: আব্বাসীয় আমলে সামাজিক ক্ষেত্রে আরব-আভিজাত্যের অবসান ঘটে। খাঁটি আরব জাতির সঙ্গে অন্যান্য জাতির সংমিশ্রণে বহু মিশ্রজাতির সৃষ্টি হয়।

2. নারীর অবস্থা: এযুগের নারীরা রাজকার্য, সাহিত্য, সংগীত প্রভৃতি বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছিল। তারা পুরুষের মতো চলাফেরার স্বাধীনতা ভোগ করত। তবে পর্দাপ্রথার প্রচলন হলে নারীস্বাধীনতা যথেষ্ট খর্ব হয়।

3. দাসপ্রথা : সমাজে দাসপ্রথার প্রচলন ছিল। তবে দাসদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করা হত।

4. সাম্য সামাজিক ক্ষেত্রে এযুগে সাম্যনীতিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হত। অমুসলমানরা ধর্মীয় ক্ষেত্রে যথেষ্ট স্বাধীনতা ভোগ করত।

5. অবসর বিনোদন: সাধারণ মানুষ দাবা, পোলো, ঘোড়দৌড়, কুস্তি প্রভৃতি খেলে ও শিকার করে অবসর যাপন করত।

6. ধনীদের জাঁকজমক: খলিফা, উচ্চপদস্থ কর্মচারী ও ধনী ব্যক্তিরা অত্যন্ত বিলাসবহুল জীবন কাটাতেন। তাদের সমাজে মদ্যপান, নর্তকী ও গায়িকার সান্নিধ্য প্রভৃতি ছিল সাধারণ বিষয়।

 

আব্বাসীয় সংস্কৃতি

D. সংস্কৃতি: আব্বাসীয় খলিফাদের আমলে আরবের

সংস্কৃতির বিভিন্ন শাখায় অভূতপূর্ব অগ্রগতি ঘটে। এজন্য এই যুগকে ইসলামের স্বর্ণযুগ বলে অভিহিত করা হয়।

1. জ্ঞানচর্চা : এযুগে প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটলের দর্শনশাস্ত্রের পুনরুদ্ধার ঘটে। বহু প্রাচীন গ্রিক শাস্ত্র এযুগে আরবি ভাষায় অনুদিত হয়। ইতিহাস, ভূগোল এবং সাহিত্যের যথেষ্ট চর্চা হয়। আল-কিন্দি, আল-ফারাবি, আল-বেরুনি, আল-গাজালি, ইবনে রুশদি, ইবনে সিনা, ইবনে খালদুন, ইবন বতুতা প্রমুখ ছিলেন এযুগের বিখ্যাত পণ্ডিত।

2. বিজ্ঞান : এযুগে আরবে গণিতশাস্ত্র, চিকিৎসা H বিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান প্রভৃতি বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় যথেষ্ট উন্নতি ঘটে।

3. ইসলামি জ্ঞানের প্রসার : আব্বাসীয় আমলের জ্ঞানচর্চা ইউরোপে স্থানান্তরিত হয়। ফলে ইউরোপে জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতি শুরু হয়। আরবের বীজগণিত, চিকিৎসাবিদ্যা, রসায়নশাস্ত্র, জ্যোতিষশাস্ত্র প্রভৃতি ইউরোপে জনপ্রিয়তা লাভ করে। 4. ইতিহাস ও সাহিত্য : এযুগে আরবে ইতিহাস ও সাহিত্যচর্চার অভূতপূর্ব অগ্রগতি ঘটে। এযুগের বিখ্যাত ঐতিহাসিক ছিলেন আলক-কালবি, ইবনে ইসহাক, আল-বালাজুরি, আল-দিনাওয়ারি, আত-তাবারি, আল-মাসুদি প্রমুখ। বিখ্যাত সাহিত্যিক ছিলেন ইস্পাহানি, ইবনে খালিকন, আনসারি, রুমি প্রমুখ।

5. স্থাপত্যশিল্প: মসজিদ নির্মাণ ছাড়াও এযুগে সমাধি সৌধ, সরকারি ভবন, রাজপ্রাসাদ, দুর্গ প্রভৃতি বিভিন্ন ধরনের স্থাপত্যশিল্পের বিকাশ ঘটে। রাজধানী বাগদাদ নগরী বহু মসজিদ প্রাসাদ ও অট্টালিকায় শোভিত হয়। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল খলিফার প্রাসাদ।

6. চিত্রশিল্প: ইসলাম চিত্রশিল্পকে স্বীকৃতি না দিলেও এযুগে চিত্রশিল্পের অগ্রগতি ঘটে। এযুগে বিভিন্ন প্রাসাদ ও প্রাচীরের দেয়ালে নানা ধরনের দৃশ্য আঁকা হত।

7. অন্যান্য শিল্প: এযুগে অন্যান্য যেসব শিল্পের অগ্রগতি ঘটে সেগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল সংগীত, হস্তশিল্প ইত্যাদি।

 

আরবের বাইরে খলিফাতন্ত্রের প্রভাব:

আরবের বাইরে বিভিন্ন দেশের মুসলিম সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে আরবের খলিফাতন্ত্রের সর্বজনীন প্রভাব লক্ষ করা গিয়েছিল। যেমন—

1. ধর্মীয় কাজ সম্পাদন: মসজিদে সমবেত নামাজ পরিচালনা, শুক্রবারের আনুষ্ঠানিক ভাষণে খুবা পাঠ, সমবেত প্রার্থনায় ইমামের কাজ নির্ধারণ প্রভৃতি ক্ষেত্রে আরবের খলিফা যে রীতিনীতির প্রচলন করেছিলেন সেই রীতিনীতি পরবর্তীকালে মুসলিম দুনিয়ায় গৃহীত হয়।

2. সামরিক কাজ: রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ শাসক ও প্রধান সেনাপতি হিসেবে আরবের খলিফাগণ অন্যান্য সেনাপতিদের নিয়োগ, বিদেশের বিরুদ্ধে সেনা অভিযান প্রেরণ প্রভৃতি কাজ করতেন। এই ধারা পরবর্তীকালে বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্রে চালু হয়।

3. বিচারকার্য : রাষ্ট্রের প্রধান বিচারক হিসেবে খলিফাগণ বিচার পরিচালনা করতেন এবং বিভিন্ন প্রদেশে ও শহরে বিচারক নিয়োগ করতেন। বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্রে বিচারব্যবস্থায় খলিফা প্রবর্তিত বিচারকার্য বিষয়ক এই রীতিনীতির প্রচলন ঘটে।

4. রাজস্ব ব্যবস্থা: আরবের খলিফাগণ কোরান নির্দেশিত চার প্রকার কর (1) জাকাৎ (স্বেচ্ছাদান), (2) জিজিয়া (অমুসলমানদের প্রদেয় ধর্মকর), (3) খারজ (ভূমিরাজস্ব) ও (4) খামস (খনিজ দ্রব্যের ওপর কর) আদায় করতেন। পরবর্তীকালে অধিকাংশ মুসলিম রাষ্ট্রে খলিফা-প্রবর্তিত অনুরূপ রাজস্ব ব্যবস্থা চালু হয়।

5. স্পেনে খলিফাতন্ত্র : উমাইয়া খলিফাদের আমলে আরবরা ৭১১ খ্রি. (মতান্তরে ৭১২ খ্রি.) ভিসিগথদের পরাজিত করে স্পেনে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা করে। প্রথমদিকে স্পেন আরব সাম্রাজ্যের একটি অংশ বলে বিবেচিত হলেও প্রথম আবদুর রহমান (৭৫৬-৭৮৮ খ্রি.) নামে জনৈক উমাইয়া যুবক আরব থেকে পালিয়ে গিয়ে স্পেনে উমাইয়া বংশের (৭৫৬-১৪৯২ খ্রি.) স্বাধীন শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। এই বংশের শাসক তৃতীয় আবদুর রহমান  (৯১২-৯৬১খ্রি.) ৯২৯ খ্রিস্টাব্দে নিজেকে ‘খলিফা’ বলে ঘোষণা করলে আরবের অনুকরণে স্পেনে খলিফাতন্ত্রের প্রসার ঘটে।

6. মিশরে খলিফাতন্ত্র : আবু আবদুল্লা নামে জনৈক শিয়া মুসলিম আরবের খলিফাতন্ত্রের অনুকরণে ৯০৯ খ্রিস্টাব্দে উত্তর আফ্রিকার টিউনিশিয়ায় একটি পৃথক খলিফাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ফাতেমীয় বংশ (৯০৯-১১৭১ খ্রি.) নামে পরিচিত। এখানেও আরবের খলিফাতন্ত্রের অনুকরণ লক্ষ করা গিয়েছিল।

আধুনিক তুরস্কের প্রতিষ্ঠাতা কে

7. তুরস্কে খলিফাতন্ত্র : আরবের খলিফাতন্ত্রের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মধ্যযুগে দ্বিতীয় মেহমেদ (১৪৪৪-১৪৪৬ খ্রি. এবং ১৪৫১-১৪৮১ খ্রি.)-এর আমল থেকে তুরস্কের অটোমান সুলতানগণও নিজেদের ‘খলিফা’ বলে ঘোষণা করেন। অটোমান খলিফারা ১৫১৭ খ্রিস্টাব্দে মামেলুক সুলতানদের পরাজিত করে এবং আরবের বৃহদংশে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। মধ্যযুগে ইউরোপের রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনের অটোমান তুর্কি শাসনের ব্যাপক প্রভাব লক্ষ করা যায়।

৪. ভারতে প্রভাব : ভারতের মুসলিম সমাজেও খলিফাতন্ত্রের প্রভাব পড়েছিল। সুলতানি আমলে ভারতের অধিকাংশ সুলতান প্রথমদিকে আরবের এবং পরবর্তীকালে অন্যান্য খলিফাদের প্রতি আনুগত্য জানিয়ে দিল্লির সুলতানি শাসন পরিচালনা করতেন। এমনকি, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর তুরস্কের খলিফার ক্ষমতা হ্রাস করা হলে ঔপনিবেশিক ভারতের মুসলিম সমাজ খলিফার সমর্থনে খিলাফৎ আন্দোলন শুরু করেছিল। এভাবে বিশ্বের বৃহদংশে দীর্ঘকাল কোনো না কোনোভাবে আরবের খলিফাতন্ত্রের প্রভাব লক্ষ করা গিয়েছিল।

 

Join Telegram
Share on:

Leave a Comment