ভারতীয় জাতীয়তাবোধের বিকাশ কি ভাবে হল, বিস্তারিত বিশ্লেষণ, বৈশিষ্ট্য ও বিশ্লেষণ

টেলিগ্রাম এ জয়েন করুন

জাতীয়তাবোধের বিকাশ কবে, কীভাবে এবং কার (কাদের) দ্বারা সৃষ্টি হয়েছিল, তা ভারতের ইতিহাসে একটি বিতর্কিত বিষয়। কেউ কেউ মনে করেন ভারতীয় জাতীয়তাবাদ ইউরোপীয়দের সৃষ্টি। কারও মতে তা ভারতীয়দের দ্বারা তৈরি হয়েছিল। বিতর্কে যাওয়ার আগে জেনে নেওয়া যাক জাতীয়তাবাদ কাকে বলে।

জাতীয়তাবাদ পুরনো ইতিহাস

জাতীয়তাবাদ কাকে বলে তা নিয়েও নানা মতামতের অস্তিত্ব রয়েছে। তবে সংক্ষেপে বলা যায় যে, জাতীয়তাবাদ হল একটি ঐক্যের অনুভূতি। যখন কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় বসবাসকারী জনসমাজের মধ্যে জাতি, ধর্ম, ভাষা প্রভৃতি এক বা একাধিক কারণে গভীর ঐক্যবোধের সৃষ্টি হয়, তখন সেই ঐক্যবোধের সঙ্গে দেশপ্রেম মিলিত হলে তাকে জাতীয়তাবাদ বলে।

প্রাক্-ব্রিটিশ যুগে ভারতে জাতিতত্ত্ব গড়ে ওঠেনি বলে প্রায় সকল ঐতিহাসিকই একমত হয়েছেন। ভ্যালেন্টাইন চিল তার ‘ইন্ডিয়া আনরেস্ট‘ গ্রন্থে এ কথাই জোর দিয়ে বলেছেন। ঐতিহাসিক গ্যালাগার, বেকার বা গর্ডন জনসন মনে করেন যে, ভারতীয় জাতীয়তাবাদ ইন্দো-ব্রিটিশ সহযোগিতার পরিণাম। মার্কসবাদী ঐতিহাসিকেরা ঔপনিবেশিক আমলের অর্থনৈতিক মানোন্নয়নের প্রেক্ষিতে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। আবার, রণজিৎ গুহের বিচারে রাজনীতির ক্ষেত্রে নিম্নবর্গই প্রধান, তাদের কার্যাবলি ও চিন্তা রাজনীতির চালিকা শক্তি।

এইভাবে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের উত্থানের পর্বে কাদের অবদান কতখানি ছিল, তা নিয়ে তর্কবিতর্ক চলতেই থাকে। জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিক, কেম্ব্রিজ গোষ্ঠীর ঐতিহাসিক, মার্কসবাদী ঐতিহাসিক কিংবা নিম্নবর্গীয় ঐতিহাসিকেরা এ বিষয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে বাস্তবায়িত করার জন্য নানা আলোচনা ও যুক্তির অবতারণ করেছেন। যাই হোক এইসব আলোচনার মধ্যে খানিকটা জায়গা জুড়ে আছে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ সৃষ্টিতে ভারতীয়দের অবদান সম্পর্কিত বিষয়টি। এ ব্যাপারে নীচে আলোচনা করা হল

বঙ্কিমচন্দ্রের জাতীয়বাদী সম্পর্কে কি ভাবনা ছিল

ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে বাংলাদেশ তথা ভারতবর্ষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মেধাবী মানুষটি ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তিনি তাঁর উপন্যাস ও প্রবন্ধের মাধ্যমে শিক্ষিত বাঙালির মনে জাতীয়তাবোধ জাগিয়ে তুলেছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্রের জাতীয়তাবাদী চিন্তার দুটি পর্যায় লক্ষ করা যায়। প্রাথমিকভাবে এই জাতীয়তাবাদ ছিল সাহিত্যকেন্দ্রিক তথা সাংস্কৃতিক। বাংলা ভাষাকে শাসকশ্রেণির ব্যবহৃত ইংরেজি ভাষার সমান মহিমায় প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তিনি অক্লান্ত চেষ্টা করেছেন। এরই সঙ্গে বাঙালির ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পুনর্নির্মাণের প্রয়োগ লক্ষ করা যায় তার রচনায়। ভাষানির্ভর এই জাতীয়তাবাদের একটা সীমাবদ্ধতা ছিল। বাঙালি জাতীয়তাবাদের গণ্ডি অতিক্রম করে সর্বভারতীয় জাতীয় চেতনার নির্মাণে হিন্দুধর্ম ছিল তাঁর হাতিয়ার। এই হিন্দুধর্ম কিন্তু জাতপাত নির্ভর গোঁড়া হিন্দুধর্ম নয় বরং

আধুনিক যুক্তিবাদের আলোয় এক নতুন ও আধুনিক হিন্দুধর্মের পরিচয় পাওয়া যায় তার কৃষ্ণ চরিত্র রচনায়। সর্বোপরি

সমাজের পিছিয়ে থাকা মানুষদের প্রতি ছিল তার ঐকান্তিক মমত্ববোধ। রামা কৈবর্ত ও হাসিম শেখের মতো চাষিদের

সঙ্গে শিক্ষিত মানুষের একাত্মতা অর্জন ছাড়া যে বাঙালি তথা ভারতীয় জ্ঞাতি গড়ে উঠবে না, এ বিষয়ে তিনি নিঃসংশয় ছিলেন।

বিখ্যাত আনন্দমঠ উপন্যাসের মধ্যে বঙ্কিমচন্দ্রের জাতীয়তাবাদী চেতনার একটি বিশেষ রূপ লক্ষ করা যায়।

আনন্দমঠ

“হরে মুরারে, মধু কৈটভারে’, ‘জয় জগদীশ হরে’, ‘বন্দেমাতরম’ ধ্বনিতে যে ‘সন্তানদল’ দেশকে মা হিসেবে কল্পনা করে সেশোদ্ধারে ঝাপিয়ে পড়েছিল, তার মর্মস্পর্শী বিবরণ রয়েছে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ উপন্যাসে। সাহিত্য সমাজের আয়না, আবার তা কখনও ভবিষ্যৎ পথের দিশারি। এই দুইয়ের অন্তর্নিহিত উপস্থিতির ফলে ‘আনন্দমঠ’ আমাদের উজ্জীবিত করে।

ছিয়াত্তরের মন্বন্তর ও সন্ন্যাসী বিদ্রোহের পটভূমিকায় লেখা ‘আনন্দমঠ‘ ঊনবিংশ শতাব্দীর জাতীয়তাবাদের বিকাশে সহায়তা করেছিল। এই উপন্যাসে মহেন্দ্র, কল্যাণী, ভবানন্দ, জীবানন্দ, শাস্তি, সত্যানন্দের মতো চরিত্রগুলি আনন্দমঠের সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী। এঁরা সংসার ও সম্পর্কের বাঁধন ছিন্ন করে সন্তানদলের সদস্য হয়েছেন। এখানে দেশকে মা বলে কল্পনা করা হয়েছে। এই উপন্যাসে দেশমাতার তিনটি রূপ তুলে ধরা হয়েছে। যেমন, মা যা ছিলেন, অর্থাৎ মায়ের জগদ্ধাত্রী মূর্তি, মাযা হয়েছেন, অর্থাৎ মায়ের কালিমা মূর্তি এবং মা যা হবেন, তা হল মায়ের দশভূজা মূর্তি। তিনি দশহাতে দশদিক রক্ষা করছেন। ‘আনন্দমঠ‘ উপন্যাসটি নানাভাবে এদেশে জাতীয়তাবাদের বিকাশে সাহায্য করেছিল। যেমন, আনন্দমঠের সন্তানদলের

আদর্শ বিপ্লবী যুবসমাজকে অনুপ্রাণিত করেছিল, যার উদাহরণ, অনুশীলন সমিতি। তা ছাড়া, এই দেশকে মা বলে উল্লেখ

করে “আনন্দমঠ” “স্বদেশপ্রেমের জোয়ারে যুব সম্প্রদায়কে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। এই উপন্যাস নারী সমাজকেও অনুপ্রাণিত অরেছিল। উদাহরণ হিসেবে বীণা দাশ, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার প্রমুখের কথা বলা যায়। সর্বোপরি, ‘বন্দেমাতরম’ ধ্বনি সারা দেশে মন্ত্রের মতো কাজ করেছিল। বন্দেমাতরম আজ ভারতবর্ষের জাতীয় সংগীত। ‘‘আনন্দমঠ’ বিপ্লবী সংগঠনের কাজেও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। সবশেষে, উপন্যাসের ভাষা ও গঠনকৌশল, জাতীয়তাবাদের আবহ তৈরি করতে সাহায্য করেছে। বিবেকানন্দের জাতীয়তাবাদী ভাবনা

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ কেবল রাজনৈতিকভাবে ভারতবর্ষকে গ্রাস করেনি। তার ভাষা, সমাজ, সংস্কৃতি, শিক্ষা এবং ধর্মকে পাশ্চাত্যের তুলনায় হীন প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করেছিল। ভারতীয় জাতীয়তাবাদীদের একটি প্রধান কর্তব্য ছিল সর্বক্ষেত্রে পরিব্যপ্ত এই হীনম্মন্যতাবোধ থেকে জাতিকে মুক্ত করা। ভাষা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে যেমন বঙ্কিমচন্দ্র ধর্মের ক্ষেত্রে তেমনই দেশীয় ধর্মকে বিদেশের সভায় এক উন্নত আসনে বসিয়ে ভারতীয় জাতিকে গর্বিত করেছিলেন বিবেকানন্দ।

শিকাগোর বিশ্ব ধর্মসম্মেলনে (1893 খ্রিস্টাব্দ) তিনি হিন্দুধর্মের উদারতা ও সহনশীলতার আদর্শকেই সবচেয়ে বড়ো বৈশিষ্ট্য বলে তুলে ধরেছিলেন। তবে বিবেকানন্দ কেবল হিন্দুধর্মের প্রচারকমাত্র নয়। তার প্রতিষ্ঠিত রামকৃষ্ণ মিশন যতটা না ধর্মের তার চেয়ে বেশি একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। এরই পাশাপাশি তিনি বলেছিলেন “লৌহকঠিন পেশি, ইস্পাত দৃঢ় স্নায়ু বজ্রের শাস্তি দিয়ে গড়া মন”-গড়ে তোলার প্রয়োজনের কথা। সর্বোপরি তিনি জোর দিয়েছিলেন আপামর ভারতবাসীকে একই ঐক্যের সুত্রে গাঁতে। বর্তমান ভারত’ প্রবন্ধে আমরা লক্ষ করি এই ঐকোরই বাণী।।

বর্তমান ভারত জাতীয়তাবাদ

জাতীয়তাবাদ বিকাশে স্বামী বিবেকানন্দের ‘বর্তমান ভারত’ এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল। ভারত ও ভারতবাসীর দুর্বলতাগুলিকে চিহ্নিত করে, সেই দুর্বলতা কাটিয়ে জাতীয়তাবাদের মহামন্ত্র ছড়িয়ে দিয়েছিল ‘বর্তমান ভারত। ভারতবর্ষ ছিল বিবেকানন্দের কাছে পুণ্যভূমি মাতৃভূমি। তার আয়ত চোখের তীব্র চাহনি, দেশপ্রেমে পরিপূর্ণ দৃপ্ত বাণী, সনাতন হিন্দুধর্মের প্রতি গভীর আস্থা ভারতবাসীকে বিদ্যুৎস্পৃষ্টের ন্যায় লুপ্ত চেতনা ফিরিয়ে দিয়েছিল।

Present-day India is published in a fortnightly magazine called ‘First Inauguration in Essays’. In the book, Vivekananda praises patriotism as a new form of nationalism in front of Indians, comparing it with India-analysis and the West from a philosophical point of view.

শ্রীমা-এর কাছে বিবেকানন্দ ছিলেন ‘খাপখোলা তলোয়ার’। শ্রীরামকুল্পের শিষ্যত্ব গ্রহণ করার পর নরেন হয়ে উঠেছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ। মাভৈঃ মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে শিকাগোর বিশ্বধর্ম সম্মেলনে তিনিভারতবর্ষকে এক অনন্য স্থান প্রদান করেন। দীর্ঘ পরিভ্রমণ, ভারত ও ভারতের বাইরের দেশসমূহের দর্শন, ভারতবাসীর প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা ও গভীর আত্মানুভূতির দ্বারা পরিচালিত হয়ে স্বামী বিবেকানন্দ ‘বর্তমান ভারত’ রচনা করেছিলেন।

জাতীয়তাবাদ উন্মেষে ‘বর্তমান ভারত’ গ্রন্থখানি নানাভাবে সহায়তা করেছিল। গ্রন্থটিতে বৈদিক যুগ, বৌদ্ধ যুগ, মুসলিম যুগ ও ব্রিটিশ যুগ্ম সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়েছে। পাশাপাশি পুরোহিততন্ত্র, রাজতন্ত্র এবং অন্যান্য বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভারতের তুলনা করে ভারতীয়দের স্বীয় মন্ত্রে দীক্ষিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। তিনি প্রাচীনকাল থেকে প্রজাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার শক্তির অভাবের কথা তুলে ধরেছেন। প্রাচীন ভারতে স্বায়ত্তশাসনের সামান্য অস্তিত্ব থাকলেও তার বিকাশ সঠিকভাবে হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন।

বৈদিক যুগে ভারতে ব্রাহ্মণ্যতত্ত্বের যে প্রাধান্য ছিল তা বৌদ্ধ যুগে এসে কমে গিয়েছিল। সেখানে জন্ম নিয়েছিল নতুন রাজশক্তি। বিবেকানন্দ পুরোহিততন্ত্র থেকে রাজতন্ত্র, রাজতন্ত্র থেকে ব্রিটিশরাজের সমালোচনার দ্বারা জাতীয়তাবাদের বীজমন্ত্র ছড়িয়ে দিয়েছিলেন গ্রন্থটিতে।


জাতীয়তাবাদের বিশ্লেষণে বিবেকানন্দ অন্যান্য দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক পটভূমিকার সঙ্গে ভারতের তুলনা টেনেছেন। চিন, সুমের, ব্যাবিলন, ইরানের সমাজের নেতৃত্ব প্রথম যুগে ছিল পুরোহিতদের হাতে। এরপর ক্ষত্রিয়কুল ক্ষমতায় আসে। এক সময় এই ক্ষমতারদণ্ড বৈশ্যদের হাতে আসবে বলে তিনি মনে করেন। বর্তমান ভারত” গ্রন্থে বিবেকানন্দ কিছু দুর্বলতাকেও তুলে ধরেছেন। সমালোচনার কশাঘাতেও বিবেকানন্দ ভারতীয়ত্ব বোধের পুনঃসারে সচেষ্ট হয়েছিলেন।

পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণকে বিবেকানন্দ তীব্র সমালোচনা করেছেন তাঁর ‘বর্তমান ভারত’ গ্রন্থে। তিনি এই গ্রন্থে তাই বলেছেন—“হে ভারত, ইহাই প্রবল বিভীষিকা। পাশ্চাত্য অনুকরণ মোহ এমনই প্রবল হইতেছে যে, ভালোমন্দের জ্ঞান, আর বুদ্ধি, বিচার, শাস্ত্র, বিবেকের দ্বারা নিষ্পন্ন হয় না।”

গ্রন্থের শেষে বিবেকানন্দ প্রশ্ন তুলেছেন, “হে ভারত, এই পরানুবাদ, পরানুকরণ, পরমুখাপেক্ষা, এই দাসসুলভ দুর্বলতা, এই ঘৃণিত জঘনা নিষ্ঠুরতা—এইমাত্র সম্বলে তুমি উচ্চাধিকার লাভ করিবে?” এর সমাধান প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, “ভুলিও না–তুমি জন্ম হইতেই ‘মায়ের জন্য বলিপ্রদত্ত।” তিনি আরও বলেছেন, “হে বীর সাহস অবলম্বন কর, সদর্পে বল— আমি ভারতবাসী, ভারতবাসী আমার ভাই, বল মুর্খ ভারতবাসী, দরিদ্র ভারতবাসী, ব্রাক্ষ্মণ ভারতবাসী, চণ্ডাল ভারতবাসী আমার ভাই; তুমিও কটিমধু-বস্ত্রাবৃত হইয়া সদর্পে ডাকিয়া বল–ভারতবাসী আমার ভাই, ভারতবাসী আমার প্রাণ”।

বিপিনচন্দ্র পাল বিবেকানন্দকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের অগ্রদূত’ রূপে উল্লেখ করেছেন। এই আধ্যাত্মিক আন্দোলনে বিবেকানন্দের ভূমিকাকে অস্বীকার করা যায় না। বিবেকানন্দ দেশপ্রেমের মাধ্যমে জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটাতে চেয়েছিলেন। বর্তমান ভারত’ গ্রন্থে তিনি লিখেছেন, “ভারতের সমাজ আমার শিশুশয্যা, আমার যৌবনের উপবন, আমার বার্ধক্যের বারাণসী; বল ডাইভারতের মৃত্তিকা আমার স্বর্গ, ভারতের কল্যাণ আমার কল্যাণ।”

সমালোচকেরা বিবেকানন্দের দেশপ্রেমের মধ্যে উগ্র হিন্দুত্বের বিকাশ লক্ষ করেছেন। কিন্তু বিবেকানন্দের দেশপ্রেমবোধ নিয়ে প্রশ্ন তোলা বোধহয় ঠিক নয়। তাঁর কাছে ভারতবর্ষ ছিল আপামর ভারতীয়র ভারতবর্ষ যেখানে উচ্চনীচ, ধনী-দরিদ্র, হিন্দু-মুসলিম সবই এক জাতি। ভারতীয়দের জাতি হিসেবে গড়ে তোলার ব্যাপারে তার উদ্যোগে কোনো ঘাটতি ছিল না।

গোরা

“I am from India today.  There is no conflict between me and any Hindu-Muslim-Christian society.  Today, everyone in India is my caste, everyone’s acid is my food.”

জাতীয়তাবোধে সিস্ত, দেশপ্রেমে অনুরক্ত– এই শব্দগুলি যাঁর মুখ দিয়ে গভীর অনুভূতির পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চারিত হয়েছিল, তিনি হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গোরা’ উপন্যাসের প্রধান চরিত্র গোরা। ঊনবিংশ শতাব্দীর যে সকল সাহিত্য জাতীয়তাবাদের ভিত্তিভূমি তৈরি করেছিল, তার মধ্যে অন্যতম এই ‘গোরা’ উপন্যাসটি। অসাম্প্রদায়িক আবহে ভারতাত্মার চিরন্তন বাণীর অনুরণন শোনা যায় এই উপন্যাসে।

ব্রাহ্ম বিবাহের পটভূমিকায় হিন্দুসমাজের টানাপোড়েনে ‘গোরা’ উপন্যাসটি গতি পেয়েছে। ললিতা ও বিনয়ের বিবাহ প্রসঙ্গে গোরা গোঁড়া হিন্দুসমাজের একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে নিজেকে তুলে ধরেছে। হিন্দুসমাজের পক্ষে গোরা তীব্র সওয়াল করে। গোরা বলে—“হিন্দুধর্ম মায়ের মতো নানা ভাবের নানা মতের লোককে কোল দেওয়ার চেষ্টা করেছে……. হিন্দুধর্ম মৃঢ়কেও মানে, জ্ঞানীকেও মানে।” ব্রাহ্মণদের উদ্দেশ্যে সুচরিতাকে উদ্দেশ্য করে গোরার উক্তি—“ভারতবর্ষের লোককে যদি আপনি অব্রাহ্ বলে দেখেন তাহলে তাদের বিকৃত করে দেখবেন এবং তাদের অবজ্ঞা করবেন।” এই গোরা যখন জানতে পারে যে সে ব্রাহ্মণ নয়; সে এক আইরিশম্যানের পুত্র। তখন সেই গোরাই পরেশের উদ্দেশ্যে বলে– “আমি আজ

মুক্ত পরেশবাবু।” গোরা আরও বলে—“আমি একেবারে ছাড়া পেয়ে হঠাৎ একটা বৃহৎ সত্যের মধ্যে এসে পড়েছি। সমস্ত ভারতবর্ষের ভালোমন্দ সুখ-দুঃখ জ্ঞান-অজ্ঞান একেবারেই আমার বুকের কাছে এসে পৌঁছেছে।”

ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায় যে, এই উপন্যাসটি নানাভাবে ভারতে জাতীয়তাবাদ সৃষ্টিতে সাহায্য করেছিল। যেমন— জাতীয়তাবাদ ও দেশপ্রেম বোধ জাতপাতের গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকতে পারে না। অসাম্প্রদায়িকতার আবহে জাতীয়তাবাদের বীজ যে লুকিয়ে আছে তা এই উপন্যাসের মধ্য দিয়ে ব্যক্ত হয়েছে। ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গে হিন্দুসমাজের বিরোধের প্রশ্নে হিন্দুসমাজের ঔদার্য ও দর্শন উপন্যাসটির কিছু অংশে বর্ণনা করা হয়েছে। হিন্দু জাতীয়তাবাদের উন্মোচনে এর কিছু অবদান লক্ষণীয়। ও উপন্যাসটির শেষ পর্বে গোরার অভিব্যক্তির মধ্য দিয়ে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের মূল সুরটি ব্যঞ্জনাময় হয়ে উঠেছে। যে গোরা হিন্দুসমাজের প্রধান রক্ষক ছিলেন, সেই গোরাই তার জন্মবৃত্তান্ত জানার পর বলে “আজ আমি এমন শুচি হয়ে উঠেছি যে চণ্ডালের ঘরেও আমার আর অপবিত্রতার ভয় রইল না।” ভারত আত্মার চিরন্তন বাণী ঐক্যের মূর্ছনা, সেই ঝংকার এখানে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়ে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের নিজস্ব রূপ হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। জাতীয়তাবাদ কী, তার স্বরূপ কী রকম হতে পারে— তার ব্যাখ্যা ও বর্ণনার মধ্য দিয়ে ‘গোরা’ উপন্যাসটি জাতীয়তাবাদের আদর্শ ভারতীয় সমাজের সামনে তুলে ধরেছে।

6 ঊনবিংশ শতাব্দীর ভারতীয় সমাজ, সমাজসংস্কার আন্দোলন, পাশ্চাত্য শিক্ষার বিস্তার, বাংলার নবজাগরণের মতো ঘটনার মধ্যে পথ হাঁটছিল। সামাজিক নানা টানাপোড়েন এই সময়ের বৈশিষ্ট্য। সেখানে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অসাম্প্রদায়িকতার বাণী ছড়িয়ে দিয়ে জাতীয়তাবাদের মূল রূপ কী হতে পারে তা ভারতীয়দের সামনে তুলে ধরেন।

টেলিগ্রাম এ জয়েন করুন
Share on:

Leave a Comment