ভগৎ সিং এর জীবনী PDF | Bhagat Singh Biography in Bengali PDF
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্নিযুগের ইতিহাসে যে নামগুলো স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র হলেন শহীদ-ই-আজম ভগৎ সিং (Bhagat Singh)। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভীত কাঁপিয়ে দেওয়া এই তরুণ বিপ্লবী মাত্র ২৩ বছর বয়সে হাসিমুখে ফাঁসির দড়ি গলায় পরেছিলেন। “ইনকিলাব জিন্দাবাদ” স্লোগানের মধ্য দিয়ে তিনি যে বিপ্লবের আগুন জ্বালিয়েছিলেন, তা আজও প্রতিটি ভারতীয়ের রক্তে শিহরণ জাগায়।
আজকের এই পোস্টে আমরা সেই মহান দেশপ্রেমিক ভগৎ সিং-এর জীবনী, তাঁর শৈশব, শিক্ষাজীবন, স্বাধীনতা সংগ্রামে অবদান, লালা লাজপত রায়ের মৃত্যুর প্রতিশোধ, সেন্ট্রাল অ্যাসেম্বলিতে বোমা নিক্ষেপ এবং তাঁর অন্তিম পরিণতি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব। পোস্টের শেষে অফলাইনে পড়ার জন্য Bhagat Singh Biography in Bengali PDF ডাউনলোডের সরাসরি লিংক দেওয়া হলো।
একনজরে ভগৎ সিং-এর সংক্ষিপ্ত পরিচয় (Quick Overview)
| পরিচিতি | বিবরণ |
| সম্পূর্ণ নাম | ভগৎ সিং (Bhagat Singh) |
| ডাকনাম / উপাধি | শহীদ-ই-আজম (Shaheed-e-Azam) |
| জন্ম তারিখ | ২৮ সেপ্টেম্বর, ১৯০৭ |
| জন্মস্থান | লায়ালপুর জেলার খাতকর কালান গ্রাম, পাঞ্জাব (বর্তমান পাকিস্তান) |
| পিতা ও মাতার নাম | সর্দার কিষান সিং সান্ধু এবং বিদ্যাবর্তী কৌর |
| বিপ্লবী সংগঠন | হিন্দুস্থান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন (HSRA), নওজওয়ান ভারত সভা |
| বিখ্যাত স্লোগান | ইনকিলাব জিন্দাবাদ (Inquilab Zindabad) |
| মৃত্যু / শহীদের তারিখ | ২৩ মার্চ, ১৯৩১ (লাহোর জেলে ফাঁসি) |
ভগৎ সিং-এর জন্ম ও বংশপরিচয়
ভগৎ সিং ১৯০৭ সালের ২৮শে সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের লায়ালপুর জেলার (যা বর্তমানে পাকিস্তানের ফয়সালাবাদ নামে পরিচিত) বাঙ্গা গ্রামে এক দেশপ্রেমিক শিখ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সর্দার কিষান সিং এবং কাকা অজিত সিং দুজনেই স্বাধীনতা সংগ্রামের সাথে যুক্ত ছিলেন। ভগৎ সিংয়ের জন্মের সময় তাঁর বাবা এবং কাকা জেল থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন। দেশপ্রেম এবং বিপ্লবের আগুন তিনি তাঁর পরিবারের কাছ থেকেই উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন।
একটি বিশেষ কাকতালীয় ঘটনা: বলা হয়ে থাকে যে, ১৯০৭ সালে যেদিন ভগৎ সিং জন্মগ্রহণ করেন, ঠিক সেই দিনই তাঁর বাবা কিষাণ সিং এবং দুই কাকা (অজিত সিং ও স্বরণ সিং) ব্রিটিশদের ‘খাল উপনিবেশীকরণ বিল’ (Canal Colonization Bill) বিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়ার দায়ে জেল থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন।
শিক্ষাজীবন ও গান্ধীজির প্রভাব
ভগৎ সিংয়ের দাদা অর্জুন সিং ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের অনুগত স্কুলে নাতিকে পড়াতে রাজি ছিলেন না। তাই তিনি ভগৎ সিংকে দয়ানন্দ অ্যাংলো-বৈদিক (D.A.V) স্কুলে ভর্তি করেন। ছোটবেলা থেকেই ভগৎ সিং অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন এবং প্রচুর বই পড়তেন।
১৯১৯ সালের জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড তাঁর মনে গভীর রেখাপাত করে। এরপর মাত্র ১৪ বছর বয়সে তিনি মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেন। কিন্তু ১৯২২ সালের চৌরি-চৌরা ঘটনার পর গান্ধীজি আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিলে, ভগৎ সিং অহিংস নীতির প্রতি আস্থা হারিয়ে সশস্ত্র বিপ্লবের পথ বেছে নেন এবং পরবর্তীকালে লাহোরের ন্যাশনাল কলেজে ভর্তি হন।
জালিয়ানওয়ালাবাগের প্রভাব: ১৯১৯ সালের ১৩ই এপ্রিল জেনারেল ডায়ারের নির্দেশে জালিয়ানওয়ালাবাগে হাজার হাজার নিরস্ত্র ভারতীয়কে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এই মর্মান্তিক ঘটনার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরেই কিশোর ভগৎ সিং স্কুল থেকে পালিয়ে সেই রক্তস্নাত হত্যাকাণ্ড পরিদর্শনে যান। এই ঘটনাই তাঁর মনে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণার জন্ম দেয়।
স্বাধীনতা সংগ্রাম ও বিপ্লবী কর্মকাণ্ড (Freedom Struggle)
১. নওজওয়ান ভারত সভা প্রতিষ্ঠা:
কলেজ জীবন শেষ না করেই ভগৎ সিং বাড়ি থেকে পালিয়ে কানপুরে চলে আসেন এবং হিন্দুস্থান রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশনে (HRA) যোগ দেন, যা পরে ‘হিন্দুস্থান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন’ (HSRA) নামে পরিচিত হয়। ১৯২৬ সালে তিনি যুবকদের মধ্যে দেশপ্রেম জাগানোর উদ্দেশ্যে ‘নওজওয়ান ভারত সভা’ প্রতিষ্ঠা করেন।
২. স্যান্ডার্স হত্যা (লালা লাজপত রায়ের মৃত্যুর প্রতিশোধ):
১৯২৮ সালে সাইমন কমিশনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ চলাকালীন ব্রিটিশ পুলিশের লাঠিচার্জে প্রবীণ স্বাধীনতা সংগ্রামী লালা লাজপত রায় গুরুতর আহত হন এবং পরে মারা যান। এর প্রতিশোধ নিতে ভগৎ সিং, শিবরাম রাজগুরু এবং চন্দ্রশেখর আজাদ ব্রিটিশ পুলিশ সুপার জেমস স্কটকে হত্যা করার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু ভুলবশত তাঁরা ২১ বছর বয়সী ব্রিটিশ পুলিশ অফিসার জন পি. স্যান্ডার্সকে গুলি করে হত্যা করেন। এরপর তাঁরা সফলভাবে লাহোর থেকে পালিয়ে যান।
৩. সেন্ট্রাল অ্যাসেম্বলিতে বোমা নিক্ষেপ:
ব্রিটিশ সরকার ‘পাবলিক সেফটি বিল’ এবং ‘ট্রেড ডিসপুট অ্যাক্ট’ নামে দুটি দমনমূলক আইন পাস করতে চাইলে, এর প্রতিবাদে ১৯২৯ সালের ৮ই এপ্রিল ভগৎ সিং এবং তাঁর সাথী বটুকেশ্বর দত্ত দিল্লির সেন্ট্রাল অ্যাসেম্বলিতে (কেন্দ্রীয় বিধানসভা) দুটি কম তীব্রতার বোমা ফেলেন। তাঁদের উদ্দেশ্য কাউকে হত্যা করা ছিল না, বরং “বধির ব্রিটিশ সরকারের কান খোলানো” ছিল তাঁদের লক্ষ্য। বোমা ফেলার পর তাঁরা পালিয়ে না গিয়ে “ইনকিলাব জিন্দাবাদ” স্লোগান দিতে দিতে স্বেচ্ছায় পুলিশের কাছে ধরা দেন।
জেলে অনশন ও বিচার প্রক্রিয়া
গ্রেপ্তারের পর ভগৎ সিং এবং তাঁর সাথীদের উপর স্যান্ডার্স হত্যা মামলার (লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা) বিচার শুরু হয়। জেলে থাকা অবস্থায় ভারতীয় এবং ব্রিটিশ বন্দীদের মধ্যে বৈষম্যের প্রতিবাদে তিনি ৬৪ দিন দীর্ঘ অনশন করেন। এই অনশনে তাঁর সহযোদ্ধা যতীন দাসের মৃত্যু হয়। অবশেষে বিচারে ভগৎ সিং, রাজগুরু এবং সুখদেবকে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়।
ভগৎ সিং-এর ফাঁসি ও মৃত্যু (Martyrdom)
১৯৩১ সালের ২৪শে মার্চ ভগৎ সিং এবং তাঁর দুই সাথীর ফাঁসির দিন ধার্য করা হয়েছিল। কিন্তু সারা দেশ জুড়ে প্রবল বিক্ষোভের আশঙ্কায় ব্রিটিশ সরকার অত্যন্ত গোপনে একদিন আগেই, অর্থাৎ ২৩শে মার্চ, ১৯৩১ সালে মাত্র ২৩ বছর বয়সে ভগৎ সিং, রাজগুরু এবং সুখদেবকে লাহোর জেলে ফাঁসি দেয়। ফাঁসির মঞ্চে ওঠার আগেও তাঁদের মুখে ছিল সেই অমর স্লোগান— “ইনকিলাব জিন্দাবাদ”।
সম্মাননা ও স্মরণ (Tributes)
- শহীদ ভগৎ সিংয়ের সম্মানে তাঁর পৈতৃক গ্রাম খটকর কালানে ‘শহীদ-ই-আজম সর্দার ভগৎ সিং মিউজিয়াম’ গড়ে তোলা হয়েছে।
- ভারত সরকার ১৯৬৮ সালে তাঁর নামে ২০ টাকার ডাকটিকিট এবং ২০১২ সালে ৫ টাকার কয়েন প্রকাশ করে।
- পাঞ্জাবের চণ্ডীগড় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নাম পরিবর্তন করে ‘শহীদ ভগৎ সিং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর’ রাখা হয়েছে।
স্যান্ডার্স হত্যা ও জওহরলাল নেহেরুর উক্তি
১৯২৮ সালের ১৭ই নভেম্বর পুলিশের লাঠিচার্জে আহত হয়ে লালা লাজপত রায় মৃত্যুবরণ করেন। ঠিক একমাস পর, ১৯২৮ সালের ১৭ই ডিসেম্বর ভগৎ সিং এবং তাঁর সাথীরা জন স্যান্ডার্সকে গুলি করে এর প্রতিশোধ নেন। এই দুঃসাহসিক কাজের পর ভগৎ সিং রাতারাতি যুবসমাজের আইকনে পরিণত হন। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু এই প্রসঙ্গে বলেছিলেন— “ভগৎ সিং তাঁর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য জনপ্রিয় হননি, বরং জনপ্রিয় হয়েছিলেন এই কারণে যে, তিনি লালা লাজপত রায়ের এবং তাঁর মাধ্যমে গোটা জাতির সম্মান রক্ষা করেছেন। কয়েক মাসের মধ্যেই পাঞ্জাবের প্রতিটি শহর ও গ্রাম তাঁর নামে মুখরিত হয়ে উঠেছিল।”
বিচার প্রক্রিয়া ও কারাদণ্ড
লাহোর ষড়যন্ত্র ও বোমার কারখানা আবিষ্কার: ১৯২৯ সালের ৮ই এপ্রিল বিধানসভায় বোমা ফেলার পর, জুন মাসের ১২ তারিখে ভগৎ সিং এবং বটুকেশ্বর দত্ত উভয়কেই যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু পুলিশি তদন্ত এগোতেই লাহোর ও সাহারানপুরে বোমার কারখানার সন্ধান পাওয়া যায় এবং তাঁর সহযোগী সুখদেব, কিশোরী লাল প্রমুখ গ্রেপ্তার হন। এরপর স্যান্ডার্স হত্যা, বিধানসভায় বোমা হামলা এবং বোমার কারখানার মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করে ব্রিটিশ সরকার ‘লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা’ শুরু করে এবং ভগৎ সিংকে লাহোরের বোস্তাল জেলে স্থানান্তর করা হয়।
ভগত সিং-এর কিছু বিখ্যাত উক্তি
- তারা আমাকে হত্যা করতে পারে, কিন্তু আমার আদর্শকে হত্যা করতে পারবে না। তারা আমার দেহকে চূর্ণ করতে পারে, কিন্তু আমার মনোবলকে চূর্ণ করতে পারবে না।
- বিপ্লব মানবজাতির এক অবিচ্ছেদ্য অধিকার। স্বাধীনতা সকলের এক অক্ষয় জন্মগত অধিকার।
- কিন্তু মানুষের কর্তব্য হলো চেষ্টা করা ও উদ্যোগ নেওয়া, সাফল্য নির্ভর করে সুযোগ ও পরিবেশের উপর।
- দর্শন হলো মানুষের দুর্বলতা বা জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার ফল।
- নির্মম সমালোচনা ও স্বাধীন চিন্তাভাবনা হলো বিপ্লবী চিন্তার দুটি অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য।
- আমি একজন মানুষ এবং যা কিছু মানবজাতিকে প্রভাবিত করে, তা আমারও বিবেচ্য বিষয়।
- বধিরদের শুনতে হলে শব্দটা খুব জোরালো হতে হবে।
- বিদ্রোহ বিপ্লব নয়। তবে এর পরিণতি শেষ পর্যন্ত সেই হতে পারে।
- জীবনের লক্ষ্য আর মনকে নিয়ন্ত্রণ করা নয়, বরং তার সুষ্ঠু বিকাশ ঘটানো; পরকালে মুক্তি লাভ করা নয়, বরং ইহলোকে জীবনের সর্বোত্তম ব্যবহার করা।
- যে কোনো মানুষ যিনি প্রগতির পক্ষে দাঁড়ান, তাকে অবশ্যই পুরাতন বিশ্বাসের প্রতিটি বিষয়কে সমালোচনা করতে, অবিশ্বাস করতে এবং চ্যালেঞ্জ জানাতে হবে।
ফাঁসি ও মৃত্যু
১৯৩১ সালের ২৩শে মার্চ সন্ধ্যা ৭:৩০ মিনিটে লাহোর জেলে ভগৎ সিং, রাজগুরু এবং সুখদেবকে ফাঁসি দেওয়া হয়।
ভগৎ সিং এর জীবনী PDF Download (Bhagat Singh Biography PDF)
স্কুল ও কলেজের প্রোজেক্ট কিংবা চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য ভগৎ সিং-এর এই সম্পূর্ণ জীবনীটি পিডিএফ (PDF) ফরম্যাটে সংগ্রহ করে রাখতে পারেন। নিচের ডাউনলোড লিংকটিতে ক্লিক করে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে PDF ফাইলটি ডাউনলোড করে নিন।
File Details:
- PDF Name: Bhagat Singh Biography in Bengali
- Language: Bengali
- Category: Biography / History
- Format: Printable PDF
- Size: 01 MB
⬇️ Download Bhagat Singh Biography in Bengali PDF Here
আরও পড়ুন
Kalikolom.com-এর তরফ থেকে প্রতিদিন নতুন জিকে (GK PDF), মহান ব্যক্তিদের জীবনী এবং চাকরির পরীক্ষার স্টাডি মেটেরিয়াল সবার আগে পেতে আমাদের টেলিগ্রাম এবং হোয়াটসঅ্যাপ কমিউনিটিতে এখনই যুক্ত হন।