দশম শ্রেণির জন্য প্রতিবেদন রচনা: সেকেন্ড সামেটিভ, টেস্ট ও মাধ্যমিকের প্রস্তুতি
ভূমিকা
দশম শ্রেণির পরীক্ষার্থীদের কাছে প্রতিবেদন রচনা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সেকেন্ড সামেটিভ, টেস্ট পরীক্ষা এবং সবশেষে মাধ্যমিক—এই তিনটি পরীক্ষাতেই প্রতিবেদন রচনার প্রশ্ন আসার সম্ভাবনা থাকে। তবে মনে রাখা দরকার, সেকেন্ড সামেটিভ ও টেস্ট পরীক্ষার প্রশ্ন প্রতিটি বিদ্যালয় নিজে তৈরি করে। তাই কোনো একটি বা দুটি প্রতিবেদন মুখস্থ করলেই যে পরীক্ষায় হুবহু কমন পেয়ে যাবে, এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। বরং বিভিন্ন ধরনের প্রতিবেদন লেখার অভ্যাস করাটাই সবচেয়ে জরুরি।
এই লেখায় দশম শ্রেণির পরীক্ষার্থীদের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ও সচরাচর জিজ্ঞাসিত টপিক এবং তার সঙ্গে তিনটি সম্পূর্ণ নমুনা প্রতিবেদন তুলে ধরা হলো, যেগুলো সচরাচর প্রচলিত নোটবই বা গাইডে সহজে পাওয়া যায় না।
পরীক্ষায় আসতে পারে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ টপিক
প্রতিবেদন রচনা অনুশীলনের সময় নিচের বিষয়গুলো মাথায় রাখা যেতে পারে। নিজের বিদ্যালয়ে সাম্প্রতিক সময়ে যে অনুষ্ঠানগুলো হয়েছে, সেগুলোর দিকে বিশেষভাবে নজর দেওয়া উচিত—
বিদ্যালয়ে পালিত কোনো একটি বিশেষ দিবস বা অনুষ্ঠান — যেমন ডক্টর শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জন্মজয়ন্তী, পশ্চিমবঙ্গ দিবস, স্বাধীনতা দিবস, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, বিজ্ঞান প্রদর্শনী কিংবা আন্তর্জাতিক যোগ দিবস।
এলাকার কোনো অনুষ্ঠান — যেমন বইমেলা, রক্তদান শিবির, অরণ্য সপ্তাহ পালন বা বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি।
এলাকায় কোনো কিছুর উদ্বোধন — যেমন লাইব্রেরি উদ্বোধন, হাসপাতাল উদ্বোধন কিংবা পানীয় জল প্রকল্পের উদ্বোধন।
সামাজিক সমস্যাভিত্তিক প্রতিবেদন — জলাভূমি বুজিয়ে বা সবুজ গাছ কেটে বহুতল নির্মাণ, ডাইনি সন্দেহে নির্যাতনের ঘটনা, মোবাইল আসক্তিতে বিপন্ন যুবসমাজ, সেলফি তুলতে গিয়ে দুর্ঘটনা, টানা বৃষ্টিতে এলাকা জলমগ্ন হওয়া, মশাবাহিত রোগের প্রকোপ, কোনো দুর্ঘটনা কিংবা বিশ্বকাপ ফুটবলের মতো ক্রীড়া সংক্রান্ত বিষয়।
এবার আসা যাক তিনটি সম্পূর্ণ নমুনা প্রতিবেদনে, যেগুলো সম্প্রতি অনেক বিদ্যালয়ে পালিত হয়েছে এবং পরীক্ষায় আসার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রতিবেদন লেখার সাধারণ কাঠামো
প্রতিবেদন লেখার আগে একটি সাধারণ কাঠামো মাথায় রাখা দরকার, যা প্রায় প্রতিটি অনুষ্ঠান-ভিত্তিক প্রতিবেদনেই প্রয়োগ করা যায়:
- শিরোনাম (হেডিং) — অনুষ্ঠানের নাম উল্লেখ করে একটি আকর্ষণীয় শিরোনাম, যা তুলনামূলক বড় হরফে খাতার মাঝখানে লেখা উচিত।
- সংবাদদাতার তথ্য ও তারিখ — নিজস্ব সংবাদদাতা হিসেবে বিদ্যালয়টি যে এলাকায় অবস্থিত, সেই এলাকার নাম এবং অনুষ্ঠানের পরের দিনের তারিখ উল্লেখ করতে হয়, যেহেতু সংবাদ সাধারণত পরদিন প্রকাশিত হয়।
- অনুষ্ঠানের সূচনা — অনুষ্ঠান কখন শুরু হলো, প্রধান অতিথি কে ছিলেন এবং কীভাবে প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে শুভ সূচনা হলো তা লিখতে হয়।
- মূল বক্তব্য ও কর্মসূচি — অতিথিদের বক্তব্যের সারমর্ম, প্রতিযোগিতা বা বিশেষ কর্মসূচির বিবরণ।
- সমাপ্তি — পুরস্কার বিতরণ বা কোনো সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি।
একটি বিশেষ বানানরীতি মনে রাখা জরুরি: বিখ্যাত বা সম্মানীয় ব্যক্তিদের নাম বা পরিচয়ের ক্ষেত্রে চন্দ্রবিন্দুর ব্যবহার (যেমন “তাঁদের”, “তাঁর”) শুদ্ধ বাংলায় ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
নমুনা প্রতিবেদন ১: বিদ্যালয়ে পালিত হলো পশ্চিমবঙ্গ দিবস
যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হলো পশ্চিমবঙ্গ দিবস
নিজস্ব সংবাদদাতা, ঠাকুরনগর, ২১শে জুন: গভীর শ্রদ্ধা ও যথাযোগ্য মর্যাদার মধ্যে দিয়ে ঠাকুরনগর উচ্চবিদ্যালয়ে পালিত হলো পশ্চিমবঙ্গ দিবস। এই দিন মূল অনুষ্ঠান শুরু হয় সকাল সাড়ে নটায়। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এলাকার বিশিষ্ট লেখক-লেখিকাগণ। তিনি এবং বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মহাশয় যৌথভাবে প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা করেন।
উদ্বোধনী সংগীতের পর প্রধান শিক্ষক ও আমন্ত্রিত অতিথিরা তাঁদের মূল্যবান বক্তব্য পেশ করেন। বক্তারা পশ্চিমবঙ্গের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে এই রাজ্যের ঐতিহাসিক অবদানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ছাত্রছাত্রীদের রাজ্যের গৌরবময় ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখার আহ্বান জানান। এই বিশেষ দিবসটি উপলক্ষে পড়ুয়াদের জন্য বাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ক একটি কুইজ এবং অঙ্কন প্রতিযোগিতারও আয়োজন করা হয়।
প্রতিযোগিতার পাশাপাশি এদিন বিদ্যালয়ে একটি মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়, যেখানে শিক্ষার্থীরা আবৃত্তি, সংগীত ও নাটক পরিবেশন করে। প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ীদের হাতে আকর্ষণীয় পুরস্কার ও সংসাপত্র তুলে দেওয়া হয়। সবশেষে বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের পরিবেশিত একটি দেশাত্মবোধক সমবেত নৃত্যের মাধ্যমে এই স্মরণীয় অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।
নমুনা প্রতিবেদন ২: বিদ্যালয়ে পালিত হলো আন্তর্জাতিক যোগ দিবস
সাড়ম্বরে পালিত হলো আন্তর্জাতিক যোগ দিবস
নিজস্ব সংবাদদাতা, বর্ধমান, ২২শে জুন: সুস্থ শরীর ও সতেজ মনের বার্তা নিয়ে বর্ধমান টাউন স্কুলে অত্যন্ত সাড়ম্বরে ও যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হলো আন্তর্জাতিক যোগ দিবস। এই দিন সকাল সাড়ে সাতটায় বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে একটি বিশেষ যোগ শিবিরের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শহরের বিখ্যাত যোগ বিশেষজ্ঞবৃন্দ। বিদ্যালয়ের প্রায় পাঁচ শতাধিক ছাত্র এবং শিক্ষক-শিক্ষিকা ও শিক্ষাকর্মীবৃন্দ অনুষ্ঠানে সক্রিয়ভাবে উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে বিদ্যালয়ের ক্রীড়া শিক্ষক ও আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত সকলের উদ্দেশ্যে মানবজীবনে যোগাভ্যাসের প্রয়োজনীয়তা বর্ণনা করেন। তাঁরা জানান, বর্তমানে ব্যস্ত ও মানসিক চাপযুক্ত জীবনে শরীর ও মনকে শান্ত রাখতে যোগাসনের কোনো বিকল্প নেই এবং পড়াশোনার চাপ কমাতে ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনার পাশাপাশি শরীরচর্চাতেও মনোযোগী হওয়া উচিত।
এরপর বিদ্যালয়ের খেলার মাঠে একটি বিশেষ যোগ শিবির পরিচালনা করা হয়। বিশেষজ্ঞদের নির্দেশনায় ছাত্র ও শিক্ষকরা একসঙ্গে প্রাণায়াম, সূর্য নমস্কার, পদ্মাসন, বজ্রাসন-সহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আসন অভ্যাস করেন। শিবিরের পাশাপাশি ছাত্ররা কিছু জটিল যোগমুদ্রা প্রদর্শন করে উপস্থিত সকলকে মুগ্ধ করে। প্রধান শিক্ষক মহাশয় তাঁর সমাপনী ভাষণে পড়ুয়াদের প্রতি নিয়মিত যোগাভ্যাস করার পরামর্শ দেন। সবশেষে উপস্থিত সকলের মধ্যে পুষ্টিকর টিফিন বিতরণের মাধ্যমে অনুষ্ঠানটির পরিসমাপ্তি ঘটে।
নমুনা প্রতিবেদন ৩: বিদ্যালয়ে পালিত হলো ডক্টর শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জন্মজয়ন্তী
যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপিত হলো শ্যামাপ্রসাদ জয়ন্তী
নিজস্ব সংবাদদাতা, মালদা, ৭ই জুলাই: আধুনিক পশ্চিমবঙ্গের রূপকার তথা বরেণ্য শিক্ষাবিদ ডক্টর শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ১২৫তম জন্মজয়ন্তী যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপিত হলো মালদা জেলা স্কুলে। গত ৬ জুলাই সকাল দশটায় বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। উদ্বোধনী বক্তৃতায় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মহাশয় ডক্টর শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের বহুমুখী প্রতিভা, শিক্ষা সংস্কারে তাঁর অবদান এবং অখণ্ড ভারতের স্বপক্ষে তাঁর বলিষ্ঠ ভূমিকার কথা ছাত্রছাত্রীদের সামনে তুলে ধরেন।
এদিন বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে পড়ুয়াদের জন্য একটি তাৎক্ষণিক বক্তৃতা ও একটি প্রবন্ধ রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়, যার মূল বিষয়ভাবনা ছিল শিক্ষার বিস্তার ও জাতীয় সংহতি রক্ষায় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ভূমিকা। এর পাশাপাশি ডক্টর মুখোপাধ্যায়ের জীবনীর ওপর একটি বিশেষ তথ্যচিত্রও প্রদর্শিত হয়।
অনুষ্ঠান শেষে সফল প্রতিযোগীদের হাতে পুরস্কার ও সংসাপত্র তুলে দেওয়া হয়। সবশেষে সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সংগীত গাওয়ার মাধ্যমে এই গৌরবময় উদযাপনের সমাপ্তি ঘটে।
শেষ কথা
উপরের তিনটি নমুনা প্রতিবেদন হুবহু মুখস্থ করাটাই একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। বরং এই কাঠামো অনুসরণ করে নিজের ভাষায়, নিজের বিদ্যালয়ে সাম্প্রতিক সময়ে পালিত অনুষ্ঠানের প্রকৃত তথ্য দিয়ে প্রতিবেদন লেখার অভ্যাস করাই পরীক্ষায় ভালো ফল করার আসল চাবিকাঠি। শিরোনাম, সংবাদদাতার তথ্য, তারিখ, প্রধান অতিথির বক্তব্য এবং অনুষ্ঠানের সমাপ্তি—এই মূল অংশগুলো ঠিক রেখে বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিবেদন লেখার চর্চা করলে যেকোনো নতুন টপিকেও সহজে ভালো নম্বর তোলা সম্ভব।











