আবহমান কবিতার প্রশ্ন ও উত্তর | নবম শ্রেণির বাংলা | Class 9 Bengali Abahaman Question Answer
প্রিয় ছাত্রছাত্রীরা, আজ আবারও তোমাদের জন্য নবম শ্রেণির বাংলা পাঠ্যসূচির অন্তর্গত নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী রচিত ‘আবহমান’ কবিতার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর নিয়ে হাজির হয়েছি।
কবির ‘অন্ধকার বারান্দা’ কাব্যগ্রন্থ থেকে সংকলিত এই কবিতায় গ্রামবাংলার চিরচেনা রূপ এবং নিজের শিকড়ের কাছে ফিরে আসার আকুলতা ফুটে উঠেছে। মানুষের সঙ্গে নিজের জন্মভূমি ও পরিচিত পরিবেশের যে গভীর টান রয়েছে, তা এই কবিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক।
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| পাঠের নাম | আবহমান |
| কবি | নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী |
| কাব্যগ্রন্থ | অন্ধকার বারান্দা |
এখানে আমরা কবিতার সামারি বা কবি পরিচিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব না। সরাসরি পরীক্ষায় আসতে পারে এমন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর নিয়ে আলোচনা করব, যাতে তোমরা সহজেই পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে পারো।
এই পোস্টে তোমরা পাবে MCQ, অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্ন, ছোট প্রশ্ন, বড়ো প্রশ্ন এবং ১, ২ ও ৩ নম্বরের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর। অর্থাৎ, পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন ও উত্তর এক জায়গায় সাজিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছি।
তোমাদের সুবিধার জন্য ‘আবহমান’ কবিতার সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর একত্রিত করে একটি PDF নোটও তৈরি করে রেখেছি। নিচে দেওয়া Download Link-এ ক্লিক করে তোমরা সহজেই PDF-টি ডাউনলোড করে নিতে পারবে।
আর যারা আগের অধ্যায়গুলোর প্রশ্ন ও উত্তর এখনও পড়োনি, তারা নিচে দেওয়া লিঙ্ক থেকে সেগুলোও দেখে নিতে পারো। এর আগে আমরা নবম শ্রেণির বাংলা পাঠ্যসূচির বেশ কয়েকটি অধ্যায় নিয়ে আলোচনা করেছি। যেমন—
- এলো বৃষ্টি ঝেঁপে
- আমার গান
- ইলিয়াস
- দাম
- নব নব সৃষ্টি
- হিমালয় দর্শন
- নোঙর
- খেয়া
- আকাশে সাতটি তারা
তাহলে আর সময় নষ্ট না করে, এবার শুরু করা যাক নবম শ্রেণির বাংলা ‘আবহমান’ কবিতার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর দিয়ে।
নবম শ্রেণির আবহমান কবিতার MCQ প্রশ্ন ও উত্তর | Class 9 Bengali Abahaman MCQ Question Answer
1. ‘আবহমান’ নামক বিখ্যাত কবিতাটি কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কোন্ কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে?
(A) নীল নির্জন
(B) উলঙ্গ রাজা
(C) অন্ধকার বারান্দা
(D) কলকাতার যীশু
উত্তর: (C) অন্ধকার বারান্দা
2. পাঠ্য কবিতায় কবি পাঠককে ঠিক কোথায় গিয়ে দাঁড়াতে বলেছেন?
(A) বারান্দায়
(B) শানবাঁধানো ঘাটে
(C) বাগানে
(D) উঠানে
উত্তর: (D) উঠানে
3. বাড়ির উঠানে গিয়ে কবি ঠিক কীসের পাশে দাঁড়াতে বলেছেন?
(A) কুয়োর
(B) তুলসীতলার
(C) লাউমাচাটার
(D) আমগাছের
উত্তর: (C) লাউমাচাটার
4. কবিতায় উল্লিখিত ‘ছোট ফুল’টি কোন্ সময়ের বাতাসে দুলছে?
(A) দুপুরের
(B) সন্ধ্যার
(C) ভোরের
(D) চৈত্রমাসের
উত্তর: (B) সন্ধ্যার
5. “কে এখানে ঘর বেঁধেছে…”—মানুষ এখানে কেমনভাবে ঘর বেঁধেছিল?
(A) ভয়ে ভয়ে
(B) নিবিড় অনুরাগে
(C) প্রয়োজনের তাগিদে
(D) অনিচ্ছায়
উত্তর: (B) নিবিড় অনুরাগে
6. “কে এখানে হারিয়ে গিয়েও আবার…”—শূন্যস্থানটি পূরণ করো।
(A) ফিরে আসে
(B) চলে যায়
(C) কেঁদে ওঠে
(D) স্মরণে রাখে
উত্তর: (A) ফিরে আসে
7. “নটেগাছটি বুড়িয়ে ওঠে, কিন্তু…”—নটেগাছটি বুড়িয়ে গেলেও কী হয় না?
(A) শুকিয়ে যায় না
(B) মুড়িয়ে যায় না
(C) ভেঙে পড়ে না
(D) ফল দেয় না
উত্তর: (B) মুড়িয়ে যায় না
8. কবিতায় মানুষের না-মেটা পিপাসাকে কবি ঠিক কেমন বলে বর্ণনা করেছেন?
(A) শান্ত
(B) লবণাক্ত
(C) মিষ্ট
(D) দুরন্ত
উত্তর: (D) দুরন্ত
9. “সারাদিন আপন মনে…”—মানুষ সারা দিন ধরে কীসের গন্ধ মাখে?
(A) ফুলের
(B) ঘাসের
(C) কাদার
(D) বৃষ্টির
উত্তর: (B) ঘাসের
10. কবি সারা রাত ধরে স্বপ্নগুলোকে কোথায় এঁকে রাখার কথা বলেছেন?
(A) তারায় তারায়
(B) পাতায় পাতায়
(C) মনে মনে
(D) খাতায় খাতায়
উত্তর: (A) তারায় তারায়
11. “নেভে না তার যন্ত্রণা যে…”—তারপর কী বলা হয়েছে?
(A) ভয় হয় না
(B) আলো জ্বলে না
(C) কান্না আসে না
(D) দুঃখ হয় না বাসি
উত্তর: (D) দুঃখ হয় না বাসি
12. বাড়ির ছোটো বাগানটি থেকে কোন্ ফুলের হাসি কখনোই হারায় না?
(A) কুন্দফুলের
(B) জুই ফুলের
(C) শিউলি ফুলের
(D) পদ্মফুলের
উত্তর: (A) কুন্দফুলের
13. “তেমন করেই সূর্য ওঠে, তেমন করেই…”—এর ঠিক পরের কথাটি কী?
(A) বৃষ্টি পড়ে
(B) বাতাস বয়
(C) ছায়া নামলে
(D) দিন কাটে
উত্তর: (C) ছায়া নামলে
14. নদীর দিক থেকে আসা সন্ধ্যার হাওয়া কীভাবে ছুটে আসে বলে কবি জানিয়েছেন?
(A) ধীর লয়ে
(B) আবার ছুটে আসে
(C) আস্তে আস্তে
(D) ঝোড়ো গতিতে
উত্তর: (B) আবার ছুটে আসে
15. মানুষের যাতায়াত সম্পর্কে কবিতায় কী বলা হয়েছে?
(A) ফুরয় না তার আসা এবং ফুরয় না তার যাওয়া
(B) ক্ষণিকের
(C) অনিশ্চিত
(D) একবারের
উত্তর: (A) ফুরয় না তার আসা এবং ফুরয় না তার যাওয়া
16. ‘আবহমান’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ আসলে কী?
(A) ক্ষণস্থায়ী
(B) চিরকালীন বা অনন্তকাল ধরে যা চলছে
(C) আধুনিক
(D) আকাশপথ
উত্তর: (B) চিরকালীন বা অনন্তকাল ধরে যা চলছে
17. এই কবিতায় কবি মূলত কোন্ বিষয়ের ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছেন?
(A) যান্ত্রিকতা
(B) শিকড়ের টান বা নাড়ির টান
(C) রাজনীতি
(D) ইতিহাস
উত্তর: (B) শিকড়ের টান বা নাড়ির টান
18. “হারায় না তার বাগান থেকে…”—বাগান থেকে কী হারায় না?
(A) কুন্দফুলের হাসি
(B) পুরোনো স্মৃতি
(C) ফল
(D) ছোট পাখি
উত্তর: (A) কুন্দফুলের হাসি
19. রূপকথার গল্পে ‘নটেগাছটি’ মূলত কীসের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়?
(A) অলসতার
(B) নতুন যুগের
(C) লৌকিক গল্পের প্রথা বা সমাপ্তির
(D) মৃত্যুর
উত্তর: (C) লৌকিক গল্পের প্রথা বা সমাপ্তির
20. “আকাশ থেকে…”—আকাশ থেকে কী নামলে হাওয়া ছুটে আসে?
(A) বৃষ্টি
(B) বিদ্যুৎ
(C) ছায়া
(D) তুষার
উত্তর: (C) ছায়া
21. “এখনও সেই ফুল দুলছে”—ফুলটি ঠিক কোথায় দুলছে?
(A) সন্ধ্যার বাতাসে
(B) নদীর তীরে
(C) জানালার ঝরোখায়
(D) শহরের পার্কে
উত্তর: (A) সন্ধ্যার বাতাসে
22. “একগুঁয়েটার দুরন্ত পিপাসা”—এখানে ‘একগুঁয়ে’ বলতে ঠিক কাকে বোঝানো হয়েছে?
(A) নটেগাছ
(B) সূর্য
(C) জল
(D) পল্লিমায়ের কোলে ফিরে আসতে চাওয়া যাযাবর মানুষকে
উত্তর: (D) পল্লিমায়ের কোলে ফিরে আসতে চাওয়া যাযাবর মানুষকে
23. মানুষের জীবনের দুঃখ কেন ‘বাসি হয় না’ বা পুরোনো হয় না?
(A) দুঃখ খুব মিষ্ট বলে
(B) এটি চিরনতুন ও প্রবহমান বলে
(C) কেউ ভোলে না বলে
(D) খুব সাধারণ বলে
উত্তর: (B) এটি চিরনতুন ও প্রবহমান বলে
24. “কে এখানে ঘর বেঁধেছে নিবিড় অনুরাগে”—এখানে ব্যবহৃত ‘অনুরাগ’ শব্দটির অর্থ কী?
(A) রাগ করা
(B) ভয়
(C) গভীর ভালোবাসা বা টান
(D) ঘৃণা
উত্তর: (C) গভীর ভালোবাসা বা টান
25. ‘আবহমান’ কবিতাটি প্রধানত কোন্ ছন্দে লেখা হয়েছে?
(A) গদ্যছন্দ
(B) দলবৃত্ত
(C) মাত্রাবৃত্ত
(D) অক্ষরবৃত্ত বা মিশ্রকলাবৃত্ত
উত্তর: (D) অক্ষরবৃত্ত বা মিশ্রকলাবৃত্ত
26. “মুড়য় না” শব্দটির প্রকৃত অর্থ কী?
(A) খুলে যায় না
(B) জন্মায় না
(C) শেষ হয় না বা ফুরিয়ে যায় না
(D) ভেঙে পড়ে না
উত্তর: (C) শেষ হয় না বা ফুরিয়ে যায় না
27. “কে এইখানে এসেছিল ______ বছর আগে”—শূন্যস্থানটি পূরণ করো।
(A) কয়েক
(B) শতেক
(C) অনেক
(D) দু-এক
উত্তর: (C) অনেক
28. “কে এইখানে হারিয়ে গিয়েও আবার ফিরে আসে…” – তারা ঠিক কীসের টানে ফিরে আসে?
(A) মানুষকে ভালোবেসে
(B) মাটিকে আর হাওয়াকে ভালোবেসে
(C) তারা আর চাঁদকে ভালোবেসে
(D) নদী আর আকাশকে ভালোবেসে
উত্তর: (B) মাটিকে আর হাওয়াকে ভালোবেসে
29. “নেভে না তার…” – মানুষের জীবনের কোন্ জিনিসটি কখনোই নেভে না?
(A) বেদনা
(B) ঘরের প্রদীপ
(C) যন্ত্রণা
(D) দুঃখের আগুন
উত্তর: (C) যন্ত্রণা
30. পাঠ্য ‘আবহমান’ কবিতাটির রচয়িতা কে?
(A) শঙ্খ ঘোষ
(B) জয় গোস্বামী
(C) নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
(D) জসীমউদ্দীন
উত্তর: (C) নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
নবম শ্রেণির বাংলা ধীবর-বৃত্তান্ত নাট্যাংশের অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (SAQ) | Class 9 Bengali Dhibar Brittanta Short Question Answer
1. ‘আবহমান’ কবিতাটি কার লেখা এবং এটি কোন্ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত?
উত্তর: ‘আবহমান’ কবিতাটি প্রখ্যাত কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর লেখা এবং এটি তাঁর ‘অন্ধকার বারান্দা’ নামক কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে।
2. পাঠ্য কবিতায় কবি পাঠককে কোথায় গিয়ে দাঁড়ানোর কথা বলেছেন?
উত্তর: কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী পুরোনো দিনের স্মৃতিবিজড়িত নিজের উঠোনে থাকা সেই চেনা লাউমাচার পাশে গিয়ে দাঁড়ানোর কথা বলেছেন।
3. কবি কেন উঠোনের লাউমাচার পাশে গিয়ে দাঁড়াতে বলেছেন?
উত্তর: কারণ, লাউমাচার পাশে দাঁড়ালে পল্লিবাংলার প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠা সেই সহজ-সরল ও অকৃত্রিম গ্রামীণ জীবনের স্বাদ এবং শৈশবের অমলিন স্মৃতিগুলোকে খুব সহজেই অনুভব করা যায়।
4. সন্ধ্যার মৃদু বাতাসে কী দুলছে বলে কবিতায় উল্লেখ করা হয়েছে?
উত্তর: সন্ধ্যার মৃদু বাতাসে উঠোনের লাউমাচায় ফুটে থাকা একটি ছোটো ফুল অবিরাম দুলছে বলে কবিতায় উল্লেখ করা হয়েছে।
5. “কে এখানে ঘর বেঁধেছে নিবিড় অনুরাগে”—এখানে মানুষ কীভাবে ঘর বেঁধেছিল?
উত্তর: মাতৃভূমি বা জন্মভূমির প্রতি প্রবল টান, গভীর মমতা ও ভালোবাসার কারণেই মানুষ পল্লিবাংলার এই মাটিতে অত্যন্ত নিবিড় অনুরাগে ঘর বেঁধেছিল।
6. “কে এখানে হারিয়ে গিয়েও আবার ফিরে আসে”—মানুষের এই হারিয়ে যাওয়ার আসল কারণ কী?
উত্তর: শৈশব পেরিয়ে যৌবনে পা দিলে মানুষ জীবিকার তাগিদে বা বৃহত্তর কর্মজীবনে জড়িয়ে পড়ে জন্মভূমি থেকে দূরে চলে যায়; কবিতায় মানুষের এই বাস্তব পরিস্থিতিকেই ‘হারিয়ে যাওয়া’ বলা হয়েছে।
7. হারিয়ে গিয়েও মানুষ আবার কীভাবে ফিরে আসে?
উত্তর: নাগরিক যন্ত্রসভ্যতায় ক্লান্ত হয়ে মানুষ নিজের শিকড়ের টানে, এই মাটিকে আর হাওয়াকে বারবার ভালোবাসে বলেই হারিয়ে গিয়েও জন্মভূমির কোলে ফিরে আসে।
8. কবিতায় মানুষের পিপাসাকে ‘দুরন্ত’ বলা হয়েছে কেন?
উত্তর: শিকড় বা জন্মভূমির টানে মানুষের মনের গভীরে যে অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষা ও অদম্য ইচ্ছা থাকে, তা কখনো শান্ত বা শেষ হয় না বলেই একে দুরন্ত পিপাসা বলা হয়েছে।
9. “নটেগাছটি বুড়িয়ে ওঠে, কিন্তু মুড়য় না”—এখানে নটেগাছ বলতে কবি কীসের ইঙ্গিত দিয়েছেন?
উত্তর: রূপকথার গল্পের সেই চেনা নটেগাছের রূপকের আড়ালে কবি এখানে মূলত মানুষের শাশ্বত জীবনধারা এবং প্রকৃতির চিরন্তন অটুট নিয়মের কথাই বুঝিয়েছেন।
10. “মুড়য় না” বলতে কবি ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছেন?
উত্তর: ‘মুড়য় না’ বলতে বোঝানো হয়েছে যে, সময় পার হলেও প্রকৃতির নিয়ম বা জন্মভূমির প্রতি মানুষের গভীর ভালোবাসা কখনোই সম্পূর্ণ শেষ বা নিঃশেষ হয়ে যায় না।
11. “ফুরয় না তার কিছুই ফুরয় না”—মানুষের জীবনে ঠিক কী ফুরোয় না?
উত্তর: জন্মভূমির প্রতি মানুষের তীব্র আসক্তি, গভীর ভালোবাসা, ফেলে আসা পুরোনো স্মৃতি এবং শিকড়ের টানে বারবার ফিরে আসার সেই প্রবল ব্যাকুলতা কখনো ফুরোয় না।
12. “তেমনি করেই সূর্য ওঠে”—বলতে কবি ঠিক কী বুঝিয়েছেন?
উত্তর: “তেমনি করেই সূর্য ওঠে” বলতে কবি প্রকৃতির সেই চিরন্তন ও শাশ্বত নিয়মের কথা বুঝিয়েছেন, ঠিক যেমনটি তিনি তাঁর নিজের শৈশবে প্রতিদিন সূর্য উঠতে দেখেছিলেন।
13. “নেভে না তার যন্ত্রণা”—এখানে কোন্ যন্ত্রণার কথা বলা হয়েছে?
উত্তর: নিজের প্রিয় গ্রাম, প্রকৃতি এবং শৈশবের চেনা পরিমণ্ডল থেকে চিরকালের মতো বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার যে গভীর মানসিক কষ্ট বা যন্ত্রণা, এখানে সেকথাই বলা হয়েছে।
14. “দুঃখ হয় না বাসি”—কথাটির অন্তর্নিহিত অর্থ কী?
উত্তর: জন্মভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কষ্ট বা দুঃখের অনুভূতি মানুষের মনের গভীরে সবসময় সতেজ বা জীবন্ত থাকে, তা সময়ের সাথে সাথে কখনো পুরোনো, বাসি বা গুরুত্বহীন হয়ে যায় না।
15. নাগরিক জীবনে পা দেওয়া ওই মানুষকে কবিতায় ‘একগুঁয়ে’ বলা হয়েছে কেন?
উত্তর: যে মানুষ শহরের কৃত্রিম জীবনকে পেছনে ফেলে বারবার নিজের গ্রামের মাটি ও প্রকৃতির কাছাকাছি ফিরে আসতে চায়, তার সেই অদম্য জেদের জন্যই তাকে ‘একগুঁয়ে’ বলা হয়েছে।
16. যাযাবর মানুষ সারা দিন ধরে কী করে?
উত্তর: মাতৃভূমির টানে ফিরে আসা সেই যাযাবর মানুষ সারা দিন ধরে আপন মনে প্রকৃতির খুব কাছাকাছি থেকে ঘাসের স্নিগ্ধ গন্ধ মাখে।
17. গভীর রাতে মানুষ আকাশের তারায় তারায় কী করে?
উত্তর: গভীর রাতে নির্জনতায় মানুষ আকাশের তারায় তারায় নিজের মনের রঙিন স্বপ্নগুলোকে খুব যত্ন করে এঁকে রাখে।
18. বাড়ির ছোট্ট বাগান থেকে কোন্ জিনিসটি কখনোই হারায় না?
উত্তর: বাড়ির ছোট্ট বাগান থেকে ফুটে থাকা শুভ্র কুন্দফুলের পবিত্র হাসি কখনোই হারিয়ে যায় না।
19. আকাশ থেকে ছায়া নামলে কোন্ হাওয়া ছুটে আসে?
উত্তর: আকাশে সূর্য ডুবে গিয়ে যখন পৃথিবীর বুকে ধীরে ধীরে ছায়া নামে, ঠিক তখনই সান্ধ্য নদীর স্নিগ্ধ হাওয়া ছুটে আসে।
20. “ফুল দুলছে, ফুল, সন্ধ্যার বাতাসে”—এই ছোটো ফুল দোলার গুরুত্ব কী?
উত্তর: সন্ধ্যার বাতাসে এই ছোটো ফুল দোলার মধ্য দিয়ে কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে, জীবনের প্রবাহ এখনো সচল এবং সুন্দর আগামীর আশা এখনো শেষ হয়ে যায়নি।
21. “যা গিয়ে ওই উঠানে তোর দাঁড়া, / লাউমাচাটার পাশে”—কবিতায় এই পঙ্ক্তিটি মোট কতবার ব্যবহৃত হয়েছে?
উত্তর: ‘আবহমান’ কবিতায় জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়ার আহ্বান সূচক এই পঙ্ক্তিটি মোট চারবার ব্যবহৃত হয়েছে।
22. ‘লাউমাচা’ জিনিসটি এখানে কীসের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে?
উত্তর: ‘লাউমাচা’ হলো গ্রামবাংলার অতি পরিচিত এক উপাদান, যা এখানে বাংলার চিরন্তন গ্রাম্য জীবন, সারল্য ও পারিবারিক অটুট বন্ধনের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
23. “কে এখানে এসেছিল অনেক বছর আগে?”—এখানে কোন্ জায়গায় আসার কথা বলা হয়েছে?
উত্তর: এখানে গ্রামবাংলার সেই চেনা উঠোনের কথা বলা হয়েছে, যেখানে একদিন ওই মানুষটির শৈশবের মধুর দিনগুলো কেটেছিল।
24. ‘আবহমান’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ কী?
উত্তর: ‘আবহমান’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হলো চিরকালীন, অর্থাৎ যা অতীত থেকে শুরু হয়ে বর্তমান পেরিয়ে অনন্তকাল ধরে একই নিয়মে চলে আসছে।
25. ‘আবহমান’ কবিতাটির মূল সুর বা মূল ভাববস্তু কী?
উত্তর: কবিতাটির মূল সুর হলো গ্রামবাংলার শাশ্বত ও অকৃত্রিম রূপের চমৎকার বর্ণনা এবং মানুষের মনের ভেতরের সেই চিরন্তন শিকড় সন্ধানী মানসিকতা।
নবম শ্রেণির আবহমান কবিতার ২ নম্বরের প্রশ্ন ও উত্তর | Class 9 Bengali Abahaman 2 Marks Question Answer
1. “যা গিয়ে ওই উঠানে তোর দাঁড়া”—এখানে উঠানটি কেমন এবং সেখানে কী কী রয়েছে?
উত্তর: কবিতায় উল্লিখিত উঠানটি আসলে শৈশবের অজস্র অমলিন স্মৃতিতে ঘেরা সেই পুরোনো চেনা ভিটে। সেই উঠোনে আজও একটা লাউমাচা দাঁড়িয়ে আছে, আর ঠিক তার পাশেই সন্ধ্যার স্নিগ্ধ বাতাসে একটা ছোট্ট ফুল অবিরাম দুলে চলেছে।
2. “একগুঁয়েটার দুরন্ত পিপাসা”—এখানে একগুঁয়ে বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে এবং তার পিপাসা ‘দুরন্ত’ কেন?
উত্তর: এখানে ‘একগুঁয়ে’ বলতে শহরের যান্ত্রিক জীবনে ক্লান্ত সেই মানুষকে বোঝানো হয়েছে, যে বারবার নিজের শেকড়ের টানে গ্রামে ফিরে আসতে চায়। জন্মভূমির প্রতি মানুষের এই নাড়ির টান এতটাই গভীর যে, হাজারো ব্যস্ততার মাঝেও সে পুরোনো ভিটেয় ফেরার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে। তার মনের এই অদম্য ও অনন্ত ইচ্ছাকেই দুরন্ত পিপাসা বলা হয়েছে।
3. “নটেগাছটা বুড়িয়ে ওঠে, কিন্তু মুড়য় না”—কথাটির গভীর তাৎপর্য বুঝিয়ে দাও।
উত্তর: আমরা জানি, রূপকথার গল্প শেষ হলেই নটেগাছ মুড়িয়ে যায়। কিন্তু কবি এখানে যে নটেগাছের কথা বলেছেন, তা বয়সের ভারে বুড়িয়ে গেলেও কখনো শেষ বা মুড়িয়ে যায় না। এর মাধ্যমে কবি মূলত বোঝাতে চেয়েছেন যে, গ্রামবাংলার চিরন্তন ঐতিহ্য, শিকড়ের টান আর মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা কখনো পুরোনো বা নিঃশেষ হয়ে যায় না।
4. “ফুরয় না তার কিছুই ফুরয় না”—এই উক্তিটির মধ্য দিয়ে কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী কী বোঝাতে চেয়েছেন?
উত্তর: মানুষ জীবন ও জীবিকার তাগিদে গ্রাম ছেড়ে শহরে গেলেও তার জন্মভূমির প্রতি ভালোবাসা কখনো ফুরিয়ে যায় না। ভিটেমাটির অমোঘ টান, বারবার গ্রামে ফিরে আসার ব্যাকুলতা এবং হারানো শৈশবকে ফিরে পাওয়ার যে আকুতি—তা মানুষের জীবনে আবহমান কাল ধরেই চলতে থাকে। কবির মতে, এই চিরন্তন চক্রটি কখনোই শেষ হয় না।
5. সারা দিন ঘাসের গন্ধ মাখা এবং স্বপ্ন এঁকে রাখার প্রকৃত তাৎপর্য কী?
উত্তর: এর অর্থ হলো শহরের ইট-কাঠের রুক্ষতা ও নাগরিক ক্লান্তি ভুলে আবারও সেই চেনা প্রকৃতির কোলে ফিরে যাওয়া। প্রকৃতির স্নিগ্ধ পরশ গায়ে মেখে আর তারায় ভরা রাতের আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে মানুষ তার ভবিষ্যতের জন্য নতুন নতুন আশা বা স্বপ্ন বুনে চলে—এখানে সেই চিরন্তন সত্যটিকেই বোঝানো হয়েছে।
6. “নেভে না তার যন্ত্রণা যে”—এখানে মানুষের কোন্ যন্ত্রণার কথা বলা হয়েছে?
উত্তর: গ্রাম ছেড়ে শহরে পাড়ি দেওয়া যাযাবর জীবনের এক অদ্ভুত ক্লান্তি আছে। নিজের ফেলে আসা ভিটেমাটি, শৈশবের চেনা উঠোন আর মাতৃভূমির জন্য শহরের মানুষের মনের গভীরে যে একটা চাপা হাহাকার বা আর্তি লুকিয়ে থাকে, এখানে মূলত সেই না-মেটা যন্ত্রণার কথাই বলা হয়েছে।
7. বাড়ির বাগান থেকে কুন্দফুলের হাসি কখনো হারিয়ে যায় না কেন?
উত্তর: মানুষের যান্ত্রিক জীবনে হাজারো দুঃখ-কষ্ট, হতাশা বা যন্ত্রণা থাকতে পারে, কিন্তু প্রকৃতির আপন ছন্দ কখনো থেমে থাকে না। প্রকৃতির এই স্বাভাবিক সতেজতা এবং চিরন্তন সৌন্দর্য বোঝাতেই কবি বলেছেন যে, শত দুঃখের মাঝেও বাগান থেকে কুন্দফুলের সেই পবিত্র হাসি কখনো ফুরিয়ে যায় না।
8. “আবার ফিরে আসে”—কে, ঠিক কী কারণে বারবার ফিরে আসে?
উত্তর: যে মানুষটি একদিন গভীর ভালোবেসে গ্রামবাংলার বুকে ঘর বেঁধেছিল এবং পরে জীবিকার প্রয়োজনে দূর শহরে হারিয়ে গিয়েছিল, এখানে তার ফিরে আসার কথাই বলা হয়েছে। শহরের হাজারো ব্যস্ততা সত্ত্বেও কেবল নিজের ফেলে আসা মাটির প্রতি ভালোবাসা এবং নাড়ির টানেই সে বারবার গ্রামে ফিরে আসে।
9. আকাশ থেকে ছায়া নামলে সান্ধ্য নদীর হাওয়া ছুটে আসে কেন?
উত্তর: দিন শেষে যখন সূর্যের আলো নিভে গিয়ে চারপাশের পরিবেশে এক অদ্ভুত শান্তি ও নিস্তব্ধতা নেমে আসে, তখনই পুরোনো স্মৃতিরা মানুষের মনে ভিড় করে। আর সেই শান্ত পরিবেশেই সান্ধ্য নদীর স্নিগ্ধ হাওয়া ছুটে এসে মানুষকে তার ফেলে আসা শৈশবের কথা মনে করিয়ে আরও বেশি স্মৃতিকাতর করে তোলে।
10. মানুষের জীবনে এই “যাওয়া” এবং “আসা” কখনো ফুরয় না কেন?
উত্তর: মানুষ তার জীবনের তাগিদে বা কর্মসংস্থানের সন্ধানে নিজের চেনা গ্রাম ছেড়ে দূর শহরে পাড়ি দেয় ঠিকই, কিন্তু তার মন বারবার ছুটে যায় সেই পুরোনো ভিটেতে। মাতৃভূমির এই অমোঘ টানে গ্রামে ফিরে আসা আর প্রয়োজনে আবার চলে যাওয়া—মানুষের জীবনের এই চক্রটি একটি শাশ্বত প্রক্রিয়া, তাই তা কখনো ফুরোয় না।
11. “সে এই মাটিকে ভালোবাসে”—এখানে ঠিক কোন্ মাটির কথা বলা হয়েছে?
উত্তর: এখানে জননী জন্মভূমির সেই পরম আদরের মাটির কথা বলা হয়েছে, যেখানে ওই মানুষটি একদিন নিবিড় অনুরাগে ঘর বেঁধেছিল। যে মাটির সোঁদা গন্ধ সে শৈশবে নিজের অস্তিত্বের সঙ্গে মিশিয়ে নিয়েছিল, এখানে সেই মাতৃভূমির মাটির কথাই সস্নেহে বলা হয়েছে।
12. ‘কুন্দফুলের হাসি’ এবং ‘দুঃখ বাসি না হওয়া’—এই দুটি বিষয়ের মধ্যে অন্তর্নিহিত সম্পর্কটি কী?
উত্তর: মানবজীবনের মুদ্রার দুটি পিঠ হলো দুঃখ এবং আনন্দ। মাতৃভূমি থেকে দূরে থাকার কষ্ট বা দুঃখ যেমন মানুষের মনে চিরকাল তাজা থাকে (কখনো বাসি হয় না), ঠিক তেমনি প্রকৃতির কোলে ফোটা কুন্দফুলের হাসি বা আনন্দও মানুষের জীবনে এক অমলিন ও শাশ্বত সৌন্দর্যের বার্তা বয়ে আনে।
সংক্ষিপ্ত ও ব্যাখ্যাভিত্তিক প্রশ্ন উত্তর | আবহমান কবিতা – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী | নবম শ্রেণির বাংলা | Class 9 Bengali Abahaman Question and Answer
1. “যা গিয়ে ওই উঠানে তোর দাঁড়া / লাউমাচাটার পাশে”—বক্তা কে? তিনি কেন এ কথা বলেছেন?
উত্তর: এই কথাটির বক্তা হলেন প্রখ্যাত কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী।
আধুনিক মানুষ তার যান্ত্রিক জীবন ও শহরের কর্মব্যস্ততায় ক্লান্ত হয়ে নিজের শেকড়কে ভুলতে বসেছে। কবি চান, মানুষ শহরের কৃত্রিমতা ছেড়ে তার ফেলে আসা শৈশবের সেই সহজ-সরল চেনা উঠোনে ফিরে যাক এবং নিজের হারানো সত্তাকে নতুন করে খুঁজে পাক। বাড়ির সেই পুরোনো উঠোন আর লাউমাচা হলো অকৃত্রিম শান্তির এক আশ্রয়স্থল, যেখানে দাঁড়ালে আজও জীবনের অমলিন রূপের দেখা মেলে। এই কথা বোঝাতেই কবি পাঠকদের ওই উঠোনে গিয়ে দাঁড়াতে বলেছেন।
2. “কে এখানে ঘর বেঁধেছে নিবিড় অনুরাগে”—এই পঙ্ক্তিটির মাধ্যমে কবির কোন্ গভীর ভাবনা ফুটে উঠেছে?
উত্তর: মানুষ জীবন বা জীবিকার তাগিদে দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়ালেও তার আদি নিবাস বা শিকড় হলো এই গ্রামবাংলা।
অতীতকাল থেকে মানুষ এই মাতৃভূমির মাটির টানেই পরম মমতা ও নিবিড় ভালোবাসায় এখানে ঘর বেঁধেছিল। কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে, মানুষের ঘর কেবল ইট-পাথরের তৈরি কোনো বস্তু নয়, তা হৃদয়ের গভীর ভালোবাসায় তৈরি হয়। প্রকৃতির কোলে ঘর বাঁধার প্রতি মানুষের এই যে আদিম, অকৃত্রিম ও নিবিড় টান—এখানে সেই চিরন্তন ভাবনার কথাই ফুটে উঠেছে।
3. “নটেগাছটা বুড়িয়ে ওঠে, কিন্তু মুড়য় না”—এই রূপকটির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: আমরা ছোটবেলায় রূপকথার শেষে একটা কথা প্রায়ই শুনতাম— ‘আমার কথাটি ফুরোল, নটেগাছটি মুড়োল’। অর্থাৎ, গল্প শেষ হলে নটেগাছটিও মুড়িয়ে বা শেষ হয়ে যায়।
কিন্তু কবি এই কবিতায় রূপকথার সেই উল্টো দিকটি তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, নটেগাছটি সময়ের সাথে সাথে হয়তো বুড়িয়ে যেতে পারে, অর্থাৎ পারিপার্শ্বিক পরিবেশ হয়তো বদলে যেতে পারে। কিন্তু গ্রামবাংলার ঐতিহ্য, মানুষের বংশপরম্পরা এবং মাতৃভূমির প্রতি তার অন্তরের টান কখনো মুড়িয়ে বা মুছে যায় না। এটি আসলে মানুষের শাশ্বত জীবনধারা ও ঐতিহ্যের অবিনশ্বরতারই এক চমৎকার রূপক।
4. “হাওয়ায় দুলছে ফুল”—এই সুন্দর চিত্রের মাধ্যমে কবি পাঠকদের কাছে কোন্ বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন?
উত্তর: সন্ধ্যার স্নিগ্ধ বাতাসে ছোট্ট ফুল দোলার এই চিত্রের মাধ্যমে কবি মূলত জীবনের প্রবহমানতা এবং এক চিরন্তন সত্যকে তুলে ধরেছেন।
আধুনিক মানুষ শহরমুখী হলেও পল্লিবাংলা আজও তার আপন সৌন্দর্য ও ঐশ্বর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শত দুঃখ-কষ্ট বা যান্ত্রিকতার মাঝেও সন্ধ্যার বাতাসে ওই ছোটো ফুল দোলার দৃশ্যটি প্রমাণ করে যে, মানবজীবন এখনো ফুরিয়ে যায়নি এবং গ্রামবাংলার বুকে আজও এক অমোঘ আকর্ষণ লুকিয়ে রয়ে গেছে। এটি আসলে জীবনের জয়গান ও অফুরন্ত আশারই এক অপূর্ব প্রতীক।
5. “হারিয়ে গিয়েও আবার ফিরে আসে”—এখানে কার ফিরে আসার কথা বলা হয়েছে? সে কেন ফিরে আসে?
উত্তর: এখানে গ্রামবাংলার সেই চিরন্তন ও সাধারণ মানুষের কথা বলা হয়েছে, যে একদিন জীবিকার তাগিদে বা যান্ত্রিকতার দাপটে শহরমুখী হয়েছিল।
শহরের নাগরিক জীবনে সে অর্থ বা স্বাচ্ছন্দ্য পেলেও তার মনের শান্তি হারিয়ে যায়। তাই সে বারবার নিজের ফেলে আসা ভিটেমাটির প্রতি ভালোবাসা এবং মাতৃভূমির হাওয়া বা শেকড়ের টানে গ্রামে ফিরে আসে। জন্মভূমির প্রতি এই যে পিছুটান, যা যাযাবর মানুষকে বারবার তার জন্মভিটায় ফিরিয়ে আনে, তাকেই কবি এখানে ফুটিয়ে তুলেছেন।
6. “ফুরয় না তার আসা এবং ফুরয় না তার যাওয়া”—উক্তিটির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।
উত্তর: মাতৃভূমির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এবং তার আসা-যাওয়া হলো মানবজীবনের এক শাশ্বত ও চিরন্তন চক্র।
মানুষ নিজের কর্মসংস্থান বা জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে নিজের জন্মভূমি বা গ্রাম ছেড়ে শহরের দিকে পাড়ি দেয় (যাওয়া)। কিন্তু শহরের যান্ত্রিক জীবনে ক্লান্ত হয়ে প্রাণের আকুলতায় বা শৈশবের স্মৃতি রোমন্থন করতে সে বারবার সেই চেনা উঠোনে ফিরে আসে (আসা)। মাতৃভূমির কোলে মানুষের এই নিরবচ্ছিন্ন যাতায়াতের প্রথাটি আবহমান কাল ধরে একইভাবে চলে আসছে বলেই তা কখনো ফুরায় না বা শেষ হয় না।
7. “দুঃখ হয় না বাসি”—কথাটির মাধ্যমে কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন?
উত্তর: সাধারণত যেকোনো পুরোনো জিনিস সময়ের সাথে সাথে বাসি বা গুরুত্বহীন হয়ে যায়। কিন্তু জন্মভূমির ভিটেমাটি হারানোর বা নিজের শেকড় থেকে চিরতরে বিচ্ছিন্ন হওয়ার যে গভীর বেদনা, তা মানুষের মনে সবসময় টাটকা বা সতেজ থাকে।
যান্ত্রিক নাগরিক জীবনে মানুষ যতই অভ্যস্ত হয়ে পড়ুক না কেন, তার অবচেতন মন এই দুঃখ বা যন্ত্রণাকে পরম যত্নে লালন করে। আর ঠিক সেই কারণেই মাতৃভূমি থেকে দূরে থাকার এই দুঃখ মানুষের কাছে কখনো বাসি বা অপ্রাসঙ্গিক হয় না।
8. “একগুঁয়েটার দুরন্ত পিপাসা”—এখানে একগুঁয়ে কাকে বলা হয়েছে এবং কেন?
উত্তর: এখানে মানুষের সেই হার না-মানা সত্তা বা যাযাবর মনকে ‘একগুঁয়ে’ বলা হয়েছে।
শহরের নাগরিক জীবনের শত বাধা, ক্লান্তি ও পরিবর্তনের মাঝেও মানুষের মন বারবার তার পুরোনো ঐতিহ্য বা চেনা ভিটেমাটিকে আঁকড়ে ধরে থাকতে চায়। নিজের জন্মভূমির প্রতি মানুষের মনের গভীরে যে একটা অদম্য তৃষ্ণা বা আকাঙ্ক্ষা লুকিয়ে থাকে, যা হাজার চেষ্টা করলেও কিছুতেই মেটে না—সেটি বোঝাতেই কবি এই ‘দুরন্ত পিপাসা’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন।
9. “সারারাত তারায় তারায় স্বপ্ন এঁকে রাখে”—যাযাবর মানুষের এই আচরণের প্রকৃত কারণ কী?
উত্তর: শহরমুখী যাযাবর মানুষ সারা দিন কঠোর পরিশ্রম করে নাগরিক যন্ত্রণায় দগ্ধ হয়। কিন্তু রাতের নিস্তব্ধতায় সে যখন আকাশের তারাগুলোর দিকে তাকায়, তখন সে তার ফেলে আসা ভিটেমাটি আর সুখের ভবিষ্যতের ছবি ওই তারার দেশে কল্পনা করে।
শহরের ইট-পাথরের মাঝে এই রঙিন স্বপ্নগুলোই তাকে নতুন করে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা দেয়। নিজের শৈশব আর মাতৃভূমির স্মৃতি বুকে নিয়ে স্বপ্ন দেখার এই চিরন্তন স্বভাবের জন্যই যাযাবর মানুষের এমন আচরণের কথা বলা হয়েছে।
10. সান্ধ্য নদীর হাওয়া এবং ছায়া নামার প্রেক্ষাপটটি সংক্ষেপে আলোচনা করো।
উত্তর: দিন শেষে যখন সূর্য ডুবে যায় এবং প্রকৃতির বুকে ধীরে ধীরে অন্ধকার বা ছায়া নামে, ঠিক তখনই সান্ধ্য নদীর শীতল হাওয়া বয়ে আসে।
গ্রামবাংলার এই গোধূলিকালীন পরিবেশটি অত্যন্ত শান্ত, স্নিগ্ধ ও স্মৃতিমেদুর হয়। শহরের যান্ত্রিক জীবনের কোলাহল যখন দিনের শেষে কমে আসে, তখনই মানুষ তার ফেলে আসা অতীত, চেনা লাউমাচা আর হারানো মাটিকে আরও নিবিড়ভাবে অনুভব করে। সেই স্মৃতিকাতরতা বোঝাতেই কবি ছায়া নামা এবং নদীর হাওয়ার প্রসঙ্গটি এনেছেন।
11. “কুন্দফুলের হাসি”—এই চমৎকার প্রতীকটির সার্থকতা বিচার করো।
উত্তর: সাদা রঙের কুন্দফুল হলো পবিত্রতা ও অকৃত্রিম আনন্দের প্রতীক। বাড়ির ছোটো বাগান থেকে কুন্দফুলের হাসি কখনো না হারানোর অর্থ হলো— মানবজীবন থেকে আনন্দ ও প্রকৃতির অমোঘ সৌন্দর্য কখনো চিরতরে মুছে যায় না।
যান্ত্রিক জীবনে মানুষের মনে শত দুঃখ, কষ্ট বা ক্লান্তি থাকতে পারে। কিন্তু প্রকৃতির এই স্বাভাবিক সতেজতা ও পবিত্রতা মানুষকে সমস্ত প্রতিকূলতার মাঝেও এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দেয়। তাই জীবনের চিরন্তন আনন্দ বোঝাতে এই প্রতীকটির ব্যবহার সম্পূর্ণ সার্থক।
12. “সে এই মাটিকে এই হাওয়াকে আবার ভালোবাসে”—মাটি ও হাওয়ার এই গুরুত্ব ঠিক কতটা?
উত্তর: মাটি ও হাওয়া হলো জন্মভূমির আসল অস্তিত্ব এবং মানুষের প্রাণের উৎস। মানুষ যে প্রাকৃতিক পরিবেশে বড়ো হয়, সেই মাটি ও হাওয়ার সঙ্গে তার এক অদৃশ্য আত্মিক বা নাড়ির বন্ধন তৈরি হয়।
জীবিকার তাগিদে মানুষ হয়তো শহরমুখী হয়ে যাযাবর জীবন কাটায়, কিন্তু মাতৃভূমির এই সোঁদা মাটি আর চেনা হাওয়ার প্রতি ভালোবাসা তার মনের গভীরে চিরকাল অটুট থাকে। এই প্রবল ভালোবাসাই মানুষকে বারবার তার নিজের শিকড়ে বা ঘরে ফিরিয়ে আনে।
13. নটেগাছ বুড়িয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে সময়ের কোন্ বিশেষ ইঙ্গিত পাওয়া যায়?
উত্তর: সময়ের সাথে সাথে পৃথিবী অনেক বদলেছে, মানুষের বয়স বেড়েছে, হয়তো গ্রামের বাইরের রূপও অনেকটাই পাল্টেছে—এটিই হলো নটেগাছের ‘বুড়িয়ে যাওয়া’।
কিন্তু এত পরিবর্তনের পরও যা বদলায়নি, তা হলো জন্মভূমির প্রতি মানুষের চিরাচরিত আবেগ। সময়ের দ্রুত গতির কাছে মানুষের এই আবেগ বা শিকড়ের টান কখনো হার মানেনি। আর এই কারণেই নটেগাছটি বয়সের ভারে বুড়িয়ে গেলেও তা কখনো মুড়িয়ে বা সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যায়নি।
14. “কে এইখানে হারিয়ে গিয়েও আবার ফিরে আসে” — পঙ্ক্তিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।
উত্তর: যে মানুষ একদিন গভীর অনুরাগ দিয়ে গ্রামসভ্যতা গড়ে তুলেছিল, সেই মানুষই পরবর্তীকালে নগরসভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে স্বাচ্ছন্দ্য আর সমৃদ্ধির খোঁজে গ্রাম ছেড়ে শহরে গিয়ে বাসা বেঁধেছিল।
কিন্তু শহরজীবন মানুষকে অনেক ঐশ্বর্য আর সমৃদ্ধি দিলেও, মনের আসল শান্তি দিতে পারেনি। তাই যান্ত্রিক নাগরিক জীবনে হারিয়ে যাওয়া মানুষ বারবার শান্তির খোঁজে তার শেকড়ের টানে সেই পুরোনো গ্রাম বা চেনা উঠোনের বুকেই ফিরে আসে। এই শাশ্বত চক্রটি বোঝাতেই কবি পঙ্ক্তিটি ব্যবহার করেছেন।
15. ‘আবহমান’ কবিতার শেষে কেন শুরুর পঙ্ক্তিগুলোই আবার ব্যবহৃত হয়েছে?
উত্তর: ‘আবহমান’ শব্দের অর্থ হলো যা অনন্তকাল ধরে একইভাবে চলে আসছে। কবিতার শেষে শুরুর পঙ্ক্তিগুলোর পুনরাবৃত্তি প্রমাণ করে যে, মাতৃভূমির সঙ্গে মানুষের এই সম্পর্কের চাকাটি ঠিক চক্রাকারে ঘোরে।
এটি একটি অন্তহীন প্রক্রিয়া। মানুষের গ্রাম ছেড়ে শহরে যাওয়া, আবার শিকড়ের টানে সেই চেনা লাউমাচার পাশে ফিরে আসা—এটি এক শাশ্বত কাল ধরে চলছে এবং ভবিষ্যতেও চলবে। জীবনের এই নিরবচ্ছিন্ন ও চিরন্তন চক্রটি বোঝানোর জন্যই কবি কবিতার শেষেও প্রথম পঙ্ক্তিগুলোর ব্যবহার করেছেন, যা এর নামকরণের সার্থকতাও প্রমাণ করে।
ক্লাস ৯ বাংলা আবহমান কবিতার গুরুত্বপূর্ণ বড়ো প্রশ্ন ও উত্তর | Class 9 Bengali Abahaman 5 Marks Important Question Answer
1. ‘আবহমান’ কবিতায় কবির যে স্বদেশপ্রেম ও শিকড় সন্ধানী মানসিকতা প্রকাশ পেয়েছে, তা বিস্তারিত আলোচনা করো।
উত্তর: কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ‘আবহমান’ কবিতাটি কেবল পল্লিবাংলার প্রকৃতির রূপবর্ণনা নয়, এটি আসলে আধুনিক মানুষের নিজের শিকড়কে খুঁজে ফেরার এক গভীর আর্তি।
- শিকড়ের সন্ধান: যান্ত্রিক নাগরিক সভ্যতায় মানুষ যখন শহরের কাছে নিজের আত্মাকে কার্যত বন্ধক রেখেছে, তখন কবি তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন তার ফেলে আসা গ্রামের সেই পুরোনো উঠোন ও চেনা লাউমাচার কথা। একসময় অত্যন্ত ভালোবাসার সঙ্গে মানুষ এই গ্রামবাংলার মাটিতেই ঘর বেঁধেছিল। কিন্তু জীবিকার প্রয়োজনে সে বারবার সেই ভিটে ছেড়ে শহরমুখী হয়েছে, যাযাবর জীবন বেছে নিয়েছে।
- স্বদেশপ্রেম ও নাড়ির টান: কবির সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ হলো—মানুষ শহরবাসী হলেও তার অবচেতন মন সবসময় পড়ে থাকে সেই পুরোনো ভিটেতে। “কে এখানে হারিয়ে গিয়েও আবার ফিরে আসে”—এই পঙ্ক্তির মাধ্যমে কবি মানুষের চিরন্তন শিকড় সন্ধানী সত্তাকেই চিনিয়েছেন। জন্মভূমির মাটির মমতা, ঘাসের সোঁদা গন্ধ আর তারায় ভরা রাতের আকাশ তাকে বারবার ঘরে ফেরার আমন্ত্রণ জানায়।
- উপসংহার: কবির মতে, নটেগাছ বুড়িয়ে গেলেও কখনো মুড়য় না, অর্থাৎ সময়ের পরিবর্তন হলেও ঐতিহ্য ও মাতৃভূমির প্রতি টান চিরকাল অমলিন থাকে। নাগরিক জীবনের হাজারো ক্লান্তি ও যন্ত্রণা থাকলেও মানুষের অন্তরে জন্মভূমির প্রতি এই গভীর ভালোবাসা আবহমান কাল ধরে সতেজ থাকে। এই স্বদেশপ্রেম কেবল একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের প্রতি নয়, তা হলো নিজের আপন অস্তিত্বের আদি ঠিকানার প্রতি এক পরম আনুগত্য।
2. “নটেগাছটা বুড়িয়ে ওঠে, কিন্তু মুড়য় না”—উক্তিটির তাৎপর্য সহজ কথায় বুঝিয়ে দাও। এই রূপকের মাধ্যমে কবি কোন চিরন্তন সত্যকে তুলে ধরেছেন?
উত্তর: প্রচলিত বাংলা লোককথা বা রূপকথার শেষে প্রায়ই একটি কথা বলা হয়— “আমার কথাটি ফুরোল, নটেগাছটি মুড়োল।” অর্থাৎ, গল্প শেষ হওয়ার সাথে সাথে নটেগাছটিও মুড়িয়ে বা শেষ হয়ে যায়। কিন্তু কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ‘আবহমান’ কবিতায় এই লোকায়ত প্রথাকে এক সম্পূর্ণ নতুন মাত্রা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, নটেগাছটি বুড়িয়ে যায় কিন্তু মুড়িয়ে বা শেষ হয়ে যায় না।
- চিরন্তন সত্য ও তাৎপর্য: এর মধ্য দিয়ে কবি এক গভীর দার্শনিক সত্যকে তুলে ধরেছেন। সময়ের গতির সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু জীর্ণ বা পুরোনো (বুড়িয়ে যাওয়া) হয় ঠিকই, গ্রামের বাহ্যিক রূপ পাল্টায়, মানুষের বয়স বাড়ে—কিন্তু মানুষের মন থেকে জন্মভূমির অমলিন স্মৃতি এবং মাতৃভূমির প্রতি গভীর টান কখনও নিঃশেষ (মুড়য় না) হয় না। আধুনিক যাযাবর মানুষ আজ শহরবাসী হতে পারে, কিন্তু তার শৈশবের সেই লাউমাচা আর উঠোন আজও তার মনের গহিনে সতেজ হয়ে বেঁচে আছে।
- রূপকের সার্থকতা: যান্ত্রিক সভ্যতার চাকায় পিষ্ট হয়ে মানুষের জীবন বিপন্ন হতে পারে, কিন্তু শেকড়ের টান এতটাই শক্তিশালী যে তা কখনো শেষ হয়ে যায় না। নটেগাছ এখানে মানবজীবন ও ঐতিহ্যের প্রতীক। বুড়িয়ে গেলেও তা সগৌরবে মানুষের স্মৃতিতে দাঁড়িয়ে থাকে। এই রূপকের মাধ্যমেই কবি জীবনের অবিনশ্বরতা ও আবহমান প্রবহমানতাকে সার্থকভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
3. ‘আবহমান’ কবিতার নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।
উত্তর: সাহিত্যের ক্ষেত্রে নামকরণ সর্বদা সেই রচনার মূল ভাববস্তুকে বহন করে। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ‘আবহমান’ কবিতাটির ক্ষেত্রেও কথাটি একইভাবে প্রযোজ্য। ‘আবহমান’ শব্দের অর্থ হলো যা চিরকালীন বা অনন্তকাল ধরে একইভাবে চলে আসছে।
- বিষয়বস্তুর সঙ্গে সম্পর্ক: কবিতাটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কবি এখানে মানুষের ফেলে আসা মাতৃভূমি ও শেকড়ের টানের কথা বলেছেন। মানুষ একসময় গভীর ভালোবাসায় পল্লিবাংলার এই ধরণীর বুকে নিবিড় ঘর বেঁধেছিল। সময়ের সাথে মানুষ শহরগামী হয়েছে, যাযাবর জীবন বেছে নিয়েছে সত্যি, কিন্তু তার নিজের ঘরে বা শেকড়ে ফেরার আকাঙ্ক্ষা কখনো ফুরিয়ে যায়নি। এই ফিরে আসার ব্যাকুলতা, মাটির প্রতি গভীর অনুরাগ এবং স্মৃতি রোমন্থন—এ সবই আবহমান কাল ধরে চলে আসছে।
- প্রকৃতির শাশ্বত রূপ: কবিতায় দেখা যায়, যান্ত্রিকতা সত্ত্বেও কুন্দফুলের হাসি হারায় না, সূর্যের উদয় ও ছায়া নামা কখনো বন্ধ হয় না এবং মানুষের পিপাসাও মেটে না। এই সবকটি অনুষঙ্গই নির্দেশ করে যে জীবনের মূল সুরটি অনন্ত প্রবহমান।
- উপসংহার: মাটির টানে যাযাবর মানুষের গ্রামে ফিরে আসা এবং সেই লাউমাচার পাশে দাঁড়ানো—মানবজীবনের এই চক্রটি কখনোই শেষ হয় না। বিষয়বস্তুর এই চিরকালীনতা বা অনন্ত প্রবহমানতাকেই কবিতাটির শিরোনামে ‘আবহমান’ শব্দটির মাধ্যমে ব্যক্ত করা হয়েছে। তাই নামকরণটি সম্পূর্ণ সার্থক ও ব্যঞ্জনাধর্মী।
4. যাযাবর মানুষের যন্ত্রণা ও প্রত্যাশার ছবি ‘আবহমান’ কবিতায় কীভাবে ফুটে উঠেছে?
উত্তর: ‘আবহমান’ কবিতায় যাযাবর মানুষ হলো আধুনিক যান্ত্রিক নাগরিক সভ্যতার সেই প্রতিনিধি, যে নিজের মাতৃভূমি থেকে শিকড়চ্যুত হয়েও প্রতিনিয়ত স্মৃতির জগতে বাস করে।
- যাযাবর মানুষের যন্ত্রণা: শহরে মানুষের জীবন আজ নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন। কবি বলেছেন— “নেভে না তার যন্ত্রণা যে, দুঃখ হয় না বাসি”। এই যন্ত্রণা হলো নিজের ঘর হারানোর যন্ত্রণা, অকৃত্রিম প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার এক চাপা হাহাকার। প্রতিকূল যান্ত্রিক জীবনে তার মাতৃভূমি থেকে দূরে থাকার দুঃখ কখনো পুরোনো বা বাসি হয় না, তা সর্বদা সতেজ যন্ত্রণায় তাকে বিদ্ধ করে।
- প্রত্যাশার ছবি: কিন্তু এই তীব্র যন্ত্রণার ওপাশে রয়েছে এক উজ্জ্বল প্রত্যাশা। শহরবাসী যাযাবর মানুষটি সারাদিন ঘাসের গন্ধ মাখে এবং রাতে তারায় তারায় রঙিন স্বপ্ন বুনে রাখে। সে বিশ্বাস করে, জীবন ফুরিয়ে যায়নি এবং তার বাড়ির বাগান থেকে কুন্দফুলের পবিত্র হাসি এখনো মুছে যায়নি। তার একটাই প্রত্যাশা—আবার সেই পুরোনো লাউমাচার পাশে গিয়ে দাঁড়ানো, যেখানে সন্ধ্যার বাতাসে চিরন্তন ফুলটি এখনো দুলছে।
- উপসংহার: যাযাবর মানুষটির এই ঘরে ফেরার “দুরন্ত পিপাসা” এবং মাটির প্রতি নিবিড় অনুরাগই তাকে শহরের যান্ত্রিক প্রতিকূলতার মধ্যে বাঁচিয়ে রাখে। যন্ত্রণার সমুদ্র পেরিয়ে নিজের শেকড়কে খুঁজে পাওয়াই হলো যাযাবর মানুষের মূল প্রত্যাশা।
5. প্রকৃতির অমোঘ সৌন্দর্য কীভাবে মানুষের জীবনের ক্লান্তি দূর করে তা ‘আবহমান’ কবিতার ভিত্তিতে আলোচনা করো।
উত্তর: কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ‘আবহমান’ কবিতায় অত্যন্ত সুন্দরভাবে দেখিয়েছেন যে, প্রকৃতিই হলো মানুষের পরম আশ্রয়স্থল। যখন যান্ত্রিক নাগরিক জীবনের কোলাহল ও ক্লান্তি মানুষকে ঘিরে ধরে, তখন প্রকৃতির ছোট ছোট উপাদানই তাকে অকৃত্রিম শান্তির পরশ দেয়।
- প্রকৃতির স্নিগ্ধ রূপ: কবিতায় লাউমাচা, দুলতে থাকা ছোটো ফুল, ঘাসের সোঁদা গন্ধ, সান্ধ্য নদীর হাওয়া এবং আকাশের তারা—এই সবকটি অনুষঙ্গই প্রকৃতির এক স্নিগ্ধ রূপকে ফুটিয়ে তোলে। কবি আহ্বান করেছেন গ্রামের সেই উঠোনে গিয়ে দাঁড়াতে, কারণ সেখানেই প্রকৃত শান্তি বিরাজ করে।
- ক্লান্তি দূর করার মন্ত্র: সারাদিন আপন মনে ঘাসের গন্ধ গায়ে মাখলে মনের বিষাক্ত নাগরিক ক্লান্তি দূর হয়। সন্ধ্যার বাতাস যখন সেই ছোটো ফুলটিকে দোলায়, তখন তা মনের গভীরে নতুন করে বাঁচার আশার সঞ্চার করে। সূর্যের উদয় এবং ছায়া নামার সাথে সাথে সান্ধ্য নদীর শীতল হাওয়া যখন মানুষের গায়ে এসে লাগে, তখন তার সারাদিনের সমস্ত যন্ত্রণা ও ক্লান্তি লঘু হয়ে যায়।
- উপসংহার: প্রতিকূলতার মাঝেও কুন্দফুলের হাসি অমলিন থাকা আসলে প্রকৃতি ও জীবনের অপরাজেয় জীবনীশক্তিকেই প্রমাণ করে। এভাবেই প্রকৃতি তার শান্ত ও নির্মল রূপের মাধ্যমে মানুষের জীবনের নিরবচ্ছিন্ন ক্লান্তি দূর করে তাকে আবহমান প্রবহমানতায় যুক্ত করে।
6. “ফুরয় না তার আসা এবং ফুরয় না তার যাওয়া”—এই পঙ্ক্তির আলোকে মানুষের বিবর্তন ও চিরন্তন প্রবৃত্তি ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: আলোচ্য পঙ্ক্তিটি মানুষের চিরকালীন গতিশীলতা এবং মানবসভ্যতার এক অমোঘ বিবর্তনকে নির্দেশ করে।
- মানুষের বিবর্তন ও গতিশীলতা: মানুষের জীবন হলো এক নিরন্তর প্রবাহ। আদিম যুগে মানুষ জঙ্গল কেটে গ্রাম বানিয়েছিল, শস্যের খেত তৈরি করেছিল এবং পরম ভালোবাসায় ও নিবিড় অনুরাগে ঘর বেঁধেছিল। এটিই ছিল তার ‘আসা’। পরবর্তীতে উন্নতির নেশায় বা জীবনধারণের কঠিন তাগিদে মানুষ সেই শান্ত পরিবেশ ছেড়ে শহরে পাড়ি দিল। সে যাযাবর হলো—এটি হলো তার ‘যাওয়া’।
- চিরন্তন প্রবৃত্তি: কিন্তু বিবর্তনের এক পর্যায়ে গিয়ে মানুষ ঠিকই বুঝতে পারল যে, শহরের যান্ত্রিকতা তাকে প্রকৃত শান্তি দিতে পারছে না। ফলে সে আবারও তার শৈশবের ঠিকানায়, মাতৃভূমির মাটির টানে ফিরে আসতে চাইল। গ্রাম ছেড়ে যাওয়া এবং আবার গ্রামে ফিরে আসার এই চক্রটি মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক শাশ্বত সত্য।
- উপসংহার: মানুষের এই প্রবৃত্তি কখনো মরে না। সে নতুনকে খুঁজতে গিয়ে পুরোনোকে হারায়, আবার হারানোকে ফিরে পেতে মনের গভীরে আর্তনাদ করে। আসা-যাওয়ার এই খেলাটি সভ্যতার চাকার মতো আবহমান কাল ধরে ঘুরছে। মানুষের এই চিরন্তন প্রবৃত্তির জন্যই কবির ভাষায় তার আসা-যাওয়ার পালা কখনো ফুরায় না।
7. “তেমনই করেই সূর্য ওঠে, তেমনি করেই ছায়া / নামলে আবার ছুটে সান্ধ্য নদীর হাওয়া।”—বক্তব্যটির প্রসঙ্গ উল্লেখ করে আলোচ্য অংশে একাধিকবার ‘তেমনি’ ব্যবহারের প্রাসঙ্গিকতা বিশ্লেষণ করো।
উত্তর: উদ্ধৃত অংশটি কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর লেখা ‘আবহমান’ কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে।
- প্রসঙ্গ: বহু বছর আগে মানুষ তার জীবন শুরু করেছিল প্রকৃতির কোলে। ভালোবাসা দিয়ে সে গড়ে তুলেছিল তার বসতি বা ভিটে। সময়ের সাথে সাথে দিন বদলেছে, কিন্তু মানুষের তার জন্মভিটের প্রতি আকর্ষণ আজও অমলিন। তাই হাজারো যান্ত্রিকতার ভিড়ে ক্লান্ত হয়ে মানুষ বারবার জন্মভূমিতে ফিরে আসে। মানুষের এই জন্মভিটের প্রতি টান আর প্রকৃতির শাশ্বত রূপ কখনো বদলায় না। এই অপরিবর্তনীয় সত্যটি বোঝাতেই কবি আলোচ্য উক্তিটি করেছেন।
- ‘তেমনি’ ব্যবহারের প্রাসঙ্গিকতা: নিজের জন্মভূমির প্রতি অদম্য আকর্ষণের কথা বলার সময় কবি বুঝিয়েছেন যে, সময় বদলে গেলেও প্রকৃতি তার আদি রূপ কখনো বদলায় নি। যখন পৃথিবী সৃষ্টি হয়েছিল, তখন যেমনভাবে পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠত, আজও ঠিক ‘তেমনই’ সূর্য ওঠে। আবার সূর্য ডোবার পর ‘তেমনই’ প্রতিদিন নদীর শীতল হাওয়া বয়ে যায়। এই ঘটনা বারবার ঘটে, প্রতিদিন ঘটে এবং আবহমান কাল ধরে অবিরত ঘটে চলেছে।
সময় চলে যায়, বছর বাড়তে থাকে, নটেগাছটির বয়স বাড়ে, কিন্তু প্রকৃতির এই চিরন্তন ঘটনা কখনো হারিয়ে যায় না। এটিই প্রকৃতির বৈশিষ্ট্য এবং জীবনের মহিমা। প্রকৃতির এই শাশ্বত ও অপরিবর্তনীয় রূপটিকে বারবার জোর দিয়ে বোঝানোর জন্যই কবি একাধিকবার ‘তেমনি’ কথাটি সার্থকভাবে ব্যবহার করেছেন।
8. “এই মাটিকে এই হাওয়াকে আবার ভালোবাসে।” — মাটি ও হাওয়াকে আবার ভালোবাসার কারণ কী?
উত্তর: কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ‘আবহমান’ কবিতাটি মূলত নিজের শিকড়ের খোঁজে আধুনিক মানুষের এক অনিঃশেষ পথ চলার কাহিনি।
- মাটি ও হাওয়ার সাথে সম্পর্ক: জীবন সৃষ্টির শুরু থেকেই মানুষ মাটি ও হাওয়ার ওপর নির্ভর করেই বেঁচে আছে। মাটি তার বাসস্থান, আর বাতাস তার শ্বাসবায়ু। সভ্যতার শুরুতে মানুষ যখন গ্রামসভ্যতা গড়ে তুলেছিল, তখন সে পরম ভালোবাসায় ও নিবিড় অনুরাগে এই মাতৃভূমির মাটিতেই ঘর বেঁধেছিল।
- আবার ভালোবাসার কারণ: কালের নিয়মে সেই মানুষই ধীরে ধীরে শহরবাসী ও নাগরিক হয়েছে। প্রকৃতি এবং গ্রামজীবনের সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি হয়েছে। কিন্তু শহরজীবনের ব্যস্ততা এবং কৃত্রিমতায় ক্লান্ত হয়ে মানুষ নিজের মনের শান্তি হারিয়ে ফেলেছে। তাই সে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য তার ফেলে আসা গ্রামজীবনের কাছে, প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়ার তাগিদ গভীরভাবে উপলব্ধি করেছে।
সে বুঝতে পেরেছে যে, শহরের চাকচিক্য তাকে শান্তি দিতে পারবে না। তাই তার ফেলে আসা উঠোন, লাউমাচা আর সন্ধ্যার বাতাসে দোল খাওয়া ছোট্ট ফুলটি তাকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করে। এই নাড়ির টান থেকেই শহরের যান্ত্রিকতায় হাঁপিয়ে ওঠা মানুষটি নিজের শেকড়কে ফিরে পেতে, সুস্থভাবে বাঁচার তাগিদে মাতৃভূমির এই মাটিকে আর হাওয়াকে আবার ভালোবাসতে শুরু করে।