প্রিয় ছাত্রছাত্রীরা, আজ আবারও তোমাদের সামনে নিয়ে হাজির হয়েছি নবম শ্রেণির বাংলা পাঠ্যসূচির অন্তর্গত, প্রখ্যাত পণ্ডিত ও সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী রচিত ‘নব নব সৃষ্টি’ প্রবন্ধের সম্পূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর নিয়ে।
এই প্রবন্ধে বাংলা ভাষার বিবর্তন, শব্দভাণ্ডার এবং বাঙালির মননশীলতার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে। লেখক দেখিয়েছেন, কীভাবে বাংলা ভাষা বিভিন্ন ভাষা ও শব্দের সংমিশ্রণে সমৃদ্ধ হয়েছে। পাশাপাশি বাঙালির চিন্তাভাবনা, সৃজনশীলতা ও বিদ্রোহী মনোভাবের কথাও এই প্রবন্ধে উঠে এসেছে।
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| পাঠের নাম | নব নব সৃষ্টি |
| লেখক | সৈয়দ মুজতবা আলী |
| মূল প্রবন্ধ | চতুরঙ্গ গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত |
এখানে আমরা প্রবন্ধের সামারি বা লেখক পরিচিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব না। সরাসরি পরীক্ষার উপযোগী প্রশ্ন ও উত্তর নিয়ে আলোচনা করব। কারণ আমি জানি, তোমরা অনেকেই পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য নির্দিষ্ট প্রশ্ন ও উত্তর খুঁজছো। তাই তোমাদের প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখেই এই পোস্টটি সাজানো হয়েছে।
এই পোস্টে তোমরা পাবে MCQ, অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্ন, ছোট প্রশ্ন, বড়ো প্রশ্ন এবং ১, ২ ও ৩ নম্বরের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর। অর্থাৎ, পরীক্ষায় আসতে পারে এমন বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন ও উত্তর এক জায়গায় তুলে ধরার চেষ্টা করেছি, যাতে তোমরা অল্প সময়ের মধ্যেই পরীক্ষার জন্য ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে পারো।
তোমাদের সুবিধার জন্য ‘নব নব সৃষ্টি’ প্রবন্ধের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর একত্রিত করে একটি PDF নোটও তৈরি করে রেখেছি। পোস্টের নিচে দেওয়া Download Link-এ ক্লিক করে তোমরা সহজেই PDF-টি ডাউনলোড করে নিতে পারবে।
বর্তমানে PDF-টি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে। তবে কতদিন বিনামূল্যে পাওয়া যাবে, তা নিশ্চিত নয়। তাই তোমাদের যাদের নোটটি প্রয়োজন, তারা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ডাউনলোড করে নিজের কাছে রেখে দিতে পারো।
তাহলে আর সময় নষ্ট না করে, এবার শুরু করা যাক নবম শ্রেণির বাংলা ‘নব নব সৃষ্টি’ প্রবন্ধের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর দিয়ে।
নবম শ্রেণির বাংলা ‘নব নব সৃষ্টি’ প্রবন্ধের MCQ প্রশ্ন ও উত্তর | Class 9 Bengali Naba Naba Srishti MCQ Question Answer
নব নব সৃষ্টি প্রবন্ধের গুরুত্বপূর্ণ ৩০টি বহুনির্বাচনি প্রশ্ন ও উত্তর (MCQ)
1. ‘নব নব সৃষ্টি’ প্রবন্ধটি বাংলা সাহিত্যের কোন বিশিষ্ট প্রাবন্ধিকের রচনা?
(A) প্রমথ চৌধুরী
(B) সৈয়দ মুজতবা আলী
(C) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
(D) বিবেকানন্দ
উত্তর: (B) সৈয়দ মুজতবা আলী
2. প্রাবন্ধিক সৈয়দ মুজতবা আলীর মতে সংস্কৃত ভাষা কেমন প্রকৃতির?
(A) পরনির্ভরশীল
(B) আত্মনির্ভরশীল ও স্বয়ংসম্পূর্ণ
(C) অসম্পূর্ণ
(D) মৃত ভাষা
উত্তর: (B) আত্মনির্ভরশীল ও স্বয়ংসম্পূর্ণ
3. বর্তমান যুগের কোন ভাষাকে লেখক ‘আত্মনির্ভরশীল নয়’ বলে দাবি করেছেন?
(A) গ্রিক
(B) আবেস্তা
(C) ইংরেজি
(D) হিব্রু
উত্তর: (C) ইংরেজি
4. বাংলা সাহিত্যে কার লেখায় আরবি-ফারসি শব্দের সবচেয়ে বেশি প্রাচুর্য চোখে পড়ে?
(A) ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
(B) কাজী নজরুল ইসলাম
(C) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
(D) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
উত্তর: (B) কাজী নজরুল ইসলাম
5. বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্য সৃষ্টি বলতে প্রাবন্ধিক কোনটিকে বুঝিয়েছেন?
(A) মঙ্গলকাব্য
(B) পদাবলী কীর্তন
(C) মহাকাব্য
(D) চর্যাপদ
উত্তর: (B) পদাবলী কীর্তন
6. কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর কোন বিখ্যাত রচনায় ‘ইনকিলাব’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন?
(A) ধূমকেতু
(B) লাঙল
(C) সঞ্চিতা
(D) ঝিঙেফুল
উত্তর: (B) লাঙল
7. ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তাঁর কোন ধরনের রচনায় বিদেশি শব্দ একেবারে ব্যবহার করতেন না?
(A) বেতাল পঞ্চবিংশতি
(B) শকুন্তলা
(C) সাধু রচনায়
(D) সীতার বনবাস
উত্তর: (C) সাধু রচনায়
8. ভারতের ইতিহাসে ঠিক কোন যুগে বাংলা ভাষায় সবচেয়ে বেশি আরবি-ফারসি শব্দ প্রবেশ করেছে?
(A) পাল যুগে
(B) আধুনিক যুগে
(C) গুপ্ত যুগে
(D) পাঠান-মোগল যুগে
উত্তর: (D) পাঠান-মোগল যুগে
9. নতুন কোনো চিন্তা বা ভাব প্রকাশের জন্য সংস্কৃত ভাষা সাধারণত কোথায় অনুসন্ধান করে?
(A) বিদেশি ভাষার ভাণ্ডারে
(B) নিজের ধাতুর ভাণ্ডারে
(C) অন্য আঞ্চলিক ভাষায়
(D) লোকমুখে
উত্তর: (B) নিজের ধাতুর ভাণ্ডারে
10. আধুনিক যুগে ইউরোপীয় ভাষাগুলো থেকে আমরা মূলত কী গ্রহণ করে থাকি?
(A) সাহিত্য
(B) ব্যাকরণ
(C) শব্দ
(D) জীবনযাপন
উত্তর: (C) শব্দ
11. হিন্দি ভাষা থেকে বিদেশি শব্দ তাড়ানোর জন্য কারা সবচেয়ে বেশি চেষ্টা করছেন?
(A) মুন্সি প্রেমচন্দ
(B) সাধারণ মানুষ
(C) অনেক হিন্দি সাহিত্যিক
(D) সরকারি আধিকারিকরা
উত্তর: (C) অনেক হিন্দি সাহিত্যিক
12. ‘হাশেমী’ বলে আরবি-ফারসি শব্দের বিরুদ্ধে কে কড়া ভাষায় জিহাদ ঘোষণা করেছিলেন?
(A) হরপ্রসাদ শাস্ত্রী
(B) প্রমথ চৌধুরী
(C) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
(D) বিদ্যাসাগর
উত্তর: (A) হরপ্রসাদ শাস্ত্রী
13. আধুনিক রসায়নবিদ্যা বা পদার্থবিদ্যার নতুন শব্দের জন্য কোন ভাষার প্রয়োজনীয়তা আমাদের কাছে অসীম?
(A) ফরাসি
(B) ল্যাটিন
(C) ইংরেজি
(D) সংস্কৃত
উত্তর: (C) ইংরেজি
14. প্রাবন্ধিকের মতে বাঙালির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বা স্বভাবের মূলে কী লুকিয়ে আছে?
(A) নম্রতা
(B) অলসতা
(C) বিদ্রোহ
(D) ধৈর্য
উত্তর: (C) বিদ্রোহ
15. বাংলা সাহিত্যে ‘আলালি’ ও ‘হুতোমি’ ভাষা ঠিক কী কারণে তৈরি হয়েছিল?
(A) হাসির উদ্রেক করার জন্য
(B) বিশেষ উদ্দেশ্যে
(C) শিক্ষার প্রসারের জন্য
(D) রাজনৈতিক কারণে
উত্তর: (B) বিশেষ উদ্দেশ্যে
16. উর্দু ভাষার বিখ্যাত কবি ইকবাল মূলত কোন ভাষাকে অনুকরণ করতে চেয়েছিলেন?
(A) হিন্দি
(B) আরবি
(C) ফারসি
(D) তুর্কি
উত্তর: (C) ফারসি
17. ভাটিয়ালির মন-মাঝি বা বৈষ্ণব পদাবলীর শ্রীরাধা চরিত্রগুলো আসলে কেমন?
(A) কাল্পনিক
(B) খাঁটি বাঙালি
(C) বিদেশি
(D) আর্য সংস্কৃতির
উত্তর: (B) খাঁটি বাঙালি
18. আমাদের দেশে এখনই ইংরেজি চর্চা বন্ধ করার সময় আসেনি কেন?
(A) বাণিজ্যের কারণে
(B) চাকরির সুযোগের জন্য
(C) টেকনিক্যাল বা প্রযুক্তিগত শব্দের প্রয়োজনে
(D) আন্তর্জাতিক যোগাযোগের জন্য
উত্তর: (C) টেকনিক্যাল বা প্রযুক্তিগত শব্দের প্রয়োজনে
19. ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তাঁর কোন ধরনের রচনায় অবলীলায় বিদেশি শব্দ ব্যবহার করতেন?
(A) সাধু রচনায়
(B) অসাধু রচনায়
(C) পাঠ্যবইয়ে
(D) অনুবাদ সাহিত্যে
উত্তর: (B) অসাধু রচনায়
20. বাংলা ভাষা থেকে আরবি-ফারসি শব্দ সমূলে বর্জন করাকে লেখক কী মনে করেন?
(A) অত্যন্ত ভালো পদক্ষেপ
(B) একেবারেই অসম্ভব ব্যাপার
(C) জরুরি কাজ
(D) খুব সহজ কাজ
উত্তর: (B) একেবারেই অসম্ভব ব্যাপার
21. বর্তমানে হিন্দি গদ্যরীতির ওপর কোন ভাষার প্রভাব সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে?
(A) বাংলা
(B) সংস্কৃত
(C) ফারসি
(D) ইংরেজি
উত্তর: (C) ফারসি
22. ‘শহিদ’ শব্দটি কার হাত ধরে বাংলা ভাষায় খাঁটি বাংলা শব্দের মর্যাদা পেয়েছে?
(A) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
(B) কাজী নজরুল ইসলাম
(C) বিদ্যাপতি
(D) জীবনানন্দ দাশ
উত্তর: (B) কাজী নজরুল ইসলাম
23. প্রাচীনকালে সংস্কৃত ভাষা খুব সামান্য বা মুষ্টিমেয় কোন ধরনের শব্দ নিজের ভাণ্ডারে গ্রহণ করেছিল?
(A) বিদেশি শব্দ
(B) ফরাসি শব্দ
(C) গ্রিক শব্দ
(D) হিন্দি শব্দ
উত্তর: (A) বিদেশি শব্দ
24. বাঙালি হিন্দু-মুসলিম উভয়েই চিরকাল কোন কাজে সবসময় তৎপর থেকেছে?
(A) সাহিত্য চর্চায়
(B) ধর্মপ্রচারে
(C) রাজনীতিতে
(D) বিদ্রোহ করতে
উত্তর: (D) বিদ্রোহ করতে
25. লেখকের মতে, বাংলা ভাষায় বিদেশি শব্দ নেওয়া ভালো না মন্দ তা এখন—
(A) বিস্তর আলোচনার বিষয়
(B) গভীর চিন্তার বিষয়
(C) একদম অবান্তর প্রশ্ন
(D) আবশ্যিক ব্যাপার
উত্তর: (C) একদম অবান্তর প্রশ্ন
26. ভারতের কোন ভাষাগুলোতে প্রচুর পরিমাণে আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে?
(A) হিন্দি ও উর্দু
(B) সিিন্ধ, উর্দু ও কাশ্মীরি
(C) বাংলা ও হিন্দি
(D) পাঞ্জাবি ও মারাঠি
উত্তর: (B) সিিন্ধ, উর্দু ও কাশ্মীরি
27. দৈনিক ‘বসুুমতী’ পত্রিকার সম্পাদকীয় লেখার ভাষা কেমন প্রকৃতির ছিল?
(A) চটুল ও হালকা
(B) বাঁকা ও ব্যঙ্গাত্মক
(C) অত্যন্ত গম্ভীর
(D) সাধারণ ও চলিত
উত্তর: (C) অত্যন্ত গম্ভীর
28. প্রাচীন গ্রিক ও ল্যাটিন মূলত কোন গোত্রের ভাষা হিসেবে পরিচিত?
(A) পরনির্ভরশীল ভাষা
(B) আধুনিক ভাষা
(C) আত্মনির্ভরশীল ভাষা
(D) প্রাদেশিক ভাষা
উত্তর: (C) আত্মনির্ভরশীল ভাষা
29. প্রাবন্ধিকের মতে রচনার ভাষা মূলত কার ওপর নির্ভর করে?
(A) লেখকের ব্যক্তিগত রুচির ওপর
(B) রচনার বিষয়বস্তুর ওপর
(C) রচনার সময়কালের ওপর
(D) পাঠকের চাহিদার ওপর
উত্তর: (B) রচনার বিষয়বস্তুর ওপর
30. ‘নব নব সৃষ্টি’ প্রবন্ধাংশটি লেখকের কোন মূল গ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে?
(A) বত্রিশ সিংহাসন
(B) পঞ্চতন্ত্র
(C) চাচা কাহিনী
(D) চতুরঙ্গ
উত্তর: (D) চতুরঙ্গ
নবম শ্রেণির বাংলা ‘নব নব সৃষ্টি’ প্রবন্ধের অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (SAQ) | Class 9 Bengali Naba Naba Srishti Short Question Answer
1. প্রাবন্ধিক সৈয়দ মুজতবা আলীর মতে ‘আত্মনির্ভরশীল’ ভাষা কোনগুলি?
উত্তর: প্রাবন্ধিকের মতে প্রাচীন যুগের সংস্কৃত, হিব্রু, গ্রিক, আবেস্তা এবং পরবর্তী যুগের আরবি হলো স্বয়ংসম্পূর্ণ বা ‘আত্মনির্ভরশীল’ ভাষা।
2. নতুন শব্দের প্রয়োজনে সংস্কৃত ভাষার বিশেষত্ব কী?
উত্তর: নতুন কোনো চিন্তা বা ভাব প্রকাশের জন্য নতুন শব্দের প্রয়োজন হলে সংস্কৃত ভাষা অন্য কোনো বিদেশি ভাষার কাছে ধার না চেয়ে নিজের ধাতুর ভাণ্ডারেই নতুন শব্দ অনুসন্ধান করে।
3. বর্তমান যুগের কোন্ কোন্ ভাষাকে লেখক আত্মনির্ভরশীল নয় বলে মনে করেছেন?
উত্তর: লেখক সৈয়দ মুজতবা আলীর মতে, বর্তমান যুগের বাংলা এবং ইংরেজি ভাষা মোটেও আত্মনির্ভরশীল নয়।
4. বাংলা ভাষায় কখন প্রচুর পরিমাণে আরবি-ফারসি শব্দ প্রবেশ করেছে?
উত্তর: ভারতের ইতিহাসে পাঠান ও মোগল শাসনকালে আইন-আদালত, খাজনা-খারিজ ইত্যাদি নতুন রাষ্ট্রীয় কাজের সূত্রেই প্রচুর আরবি-ফারসি শব্দ বাংলা ভাষায় প্রবেশ করেছে।
5. “সে সম্বন্ধেও কারও কোনো সন্দেহ নেই।” — কোন্ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই?
উত্তর: শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ইংরেজির বদলে বাংলা ভাষাকে গ্রহণ করা হলে যে প্রচুর পরিমাণে ইউরোপীয় শব্দ বাংলা ভাষায় প্রবেশ করবে, লেখক সে বিষয়েই কোনো সন্দেহ নেই বলে জানিয়েছেন।
6. লেখক বিদেশি শব্দ বর্জনকে কেন ‘অসম্ভব’ বলেছেন?
উত্তর: লেখকের মতে, আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আলুকপি বা বিলিতি ওষুধের মতো বিদেশি শব্দগুলো এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে, সেগুলো রান্নাঘর বা জীবন থেকে তাড়িয়ে দেওয়া প্রায় অসম্ভব।
7. কাজী নজরুল ইসলাম কীভাবে বাংলা শব্দভাণ্ডারে নতুন শব্দ যোগ করেছেন?
উত্তর: কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর রচনায় ‘ইনকিলাব’, ‘শহিদ’ প্রভৃতি আরবি-ফারসি শব্দ অত্যন্ত সার্থকভাবে প্রয়োগ করে সেগুলোকে বাংলা ভাষার নিজস্ব সম্পদে পরিণত করেছেন।
8. ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তাঁর কোন্ ধরনের রচনায় বিদেশি শব্দ ব্যবহার করতেন?
উত্তর: বিদ্যাসাগর তাঁর সাধু ভাষার রচনায় বিদেশি শব্দ এড়িয়ে চললেও, বেনামিতে লেখা ‘অসাধু’ রচনা বা বিতর্কমূলক লেখায় অবলীলায় প্রচুর আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহার করতেন।
9. “এখানে আর একটি কথা বলে রাখা ভালো।” — লেখক কোন্ কথাটি বলে রাখা ভালো বলে মনে করেছেন?
উত্তর: রচনার ভাষা যে মূলত তার বিষয়বস্তুর ওপর নির্ভর করে, প্রাবন্ধিক সৈয়দ মুজতবা আলী এখানে সেই কথাটিই বলে রাখা ভালো বলে মনে করেছেন।
10. স্কুল-কলেজ থেকে আমাদের সংস্কৃত চর্চা উঠিয়ে দেওয়া উচিত নয় কেন?
উত্তর: সংস্কৃত ভাষাই হলো বাংলা শব্দভাণ্ডারের প্রধান উৎস বা খাদ্যের জোগানদার। তাই বাংলা ভাষায় নতুন সংস্কৃত শব্দের প্রয়োজন মেটাতেই আমাদের সংস্কৃত চর্চা বজায় রাখা উচিত।
11. কোন্ বিশেষ বিশেষ বিদ্যাচর্চায় ইংরেজি ভাষার প্রয়োজন এখনও অসীম?
উত্তর: আধুনিক যুগের দর্শন, নন্দনতত্ত্ব এবং বিশেষ করে পদার্থবিদ্যা ও রসায়নবিদ্যার মতো বিজ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে ইংরেজি ভাষার প্রয়োজনীয়তা এখনও অনেকখানি রয়ে গেছে।
12. “বহু সাহিত্যিক উঠে পড়ে লেগেছেন” — কোন্ ভাষার সাহিত্যিকদের কথা এখানে বলা হয়েছে?
উত্তর: বর্তমান সময়ে হিন্দি ভাষা থেকে আরবি-ফারসি শব্দ চিরতরে দূর করার জন্য যেসকল হিন্দি ভাষার সাহিত্যিক উঠে পড়ে লেগেছেন, এখানে তাঁদের কথাই বলা হয়েছে।
13. হিন্দি ভাষাসাহিত্যের ‘বঙ্কিম’ কাকে বলা হয়?
উত্তর: বিখ্যাত সাহিত্যিক মুন্সী প্রেমচন্দকে তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য হিন্দি ভাষাসাহিত্যের ‘বঙ্কিম’ বলা হয়।
14. ভারতবর্ষীয় কোন্ তিনটি ভাষা ফারসির মতো উন্নত সাহিত্য সৃষ্টি করতে পারেনি?
উত্তর: ভারতবর্ষীয় সিন্ধি, উর্দু এবং কাশ্মীরি ভাষা প্রচুর আরবি-ফারসি শব্দ গ্রহণ করলেও, ফারসির মতো সমৃদ্ধ ও ঐশ্বর্যশালী সাহিত্য সৃষ্টি করতে পারেনি।
15. উর্দু সাহিত্যের মূল সুর মূলত কোন্ ভাষার সঙ্গে বাঁধা?
উত্তর: অনেকেই উর্দুকে আরবির কাছাকাছি মনে করলেও, আসলে উর্দু সাহিত্যের মূল সুর ফারসি ভাষার সঙ্গেই নিবিড়ভাবে বাঁধা।
16. ‘নব নব সৃষ্টি’ রচনাংশে লেখক কোন্ বিখ্যাত উর্দু কবির কথা উল্লেখ করেছেন?
উত্তর: প্রাবন্ধিক সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর ‘নব নব সৃষ্টি’ রচনাংশে বিখ্যাত উর্দু কবি ইকবালের কথা উল্লেখ করেছেন, যিনি ফারসির অনুকরণে উর্দু সাহিত্য সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন।
17. “ধর্ম বদলালেই জাতির চরিত্র বদলায় না।” – লেখক কেন এমন কথা বলেছেন?
উত্তর: বাঙালির যে চিরাচরিত বিদ্রোহী সত্তা, তা কেবল বাঙালি হিন্দুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বাঙালি মুসলমানরাও অন্যায় ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সমান তৎপর। এই চারিত্রিক মিল বোঝাতেই লেখক কথাটি বলেছেন।
18. বাঙালির চারিত্রিক বিদ্রোহ কোন্ কোন্ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পেয়েছে?
উত্তর: বাঙালির চরিত্রের এই মজ্জাগত বিদ্রোহ মূলত রাজনীতি, ধর্ম এবং সাহিত্য—এই তিনটি প্রধান ক্ষেত্রেই বারবার প্রবলভাবে প্রকাশ পেয়েছে।
19. প্রাবন্ধিকের মতে বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্য সৃষ্টি কোনটি?
উত্তর: প্রাবন্ধিক সৈয়দ মুজতবা আলীর মতে, বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্য সৃষ্টি হলো পদাবলী কীর্তন।
20. পদাবলী কীর্তনের সাহিত্যকে লেখক কেন সর্বশ্রেষ্ঠ বলেছেন?
উত্তর: কারণ এই সাহিত্যের প্রাণ এবং দেহ উভয়ই হলো খাঁটি বাঙালির। এর মধ্যে বাইরের কোনো প্রভাব নেই, বরং বাঙালির নিজস্ব আবেগ ও সত্তা এর পরতে পরতে ফুটে উঠেছে।
21. ‘আলাল’ ও ‘হুতোম’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: ‘আলাল’ বলতে প্যারীচাঁদ মিত্রের লেখা ‘আলালের ঘরের দুলাল’ এবং ‘হুতোম’ বলতে কালীপ্রসন্ন সিংহের ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’ নামক বিখ্যাত গ্রন্থ দুটিকে বোঝানো হয়েছে।
22. ‘হুতোমি’ ভাষার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে লেখক কী বলেছেন?
উত্তর: লেখক বলেছেন যে, ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’-র ভাষা মূলত হাস্যকৌতুক বা ব্যঙ্গ করার বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়েই তৈরি হয়েছিল, যা মূল ধারার বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে পুরোপুরি মিশে যায়নি।
23. “সেগুলো নিয়ে অত্যধিক দুশ্চিন্তা করার কোনো কারণ নেই।” — কোন্ বিষয়ে দুশ্চিন্তা করা নিষ্প্রয়োজন?
উত্তর: পর্তুগিজ, ফরাসি, স্প্যানিশ প্রভৃতি ইউরোপীয় ভাষার শব্দ বাংলা শব্দভাণ্ডারে এতই কম এসেছে যে, সেগুলো নিয়ে অযথা দুশ্চিন্তা করার কোনো কারণ নেই।
24. ভাটিয়ালির মন-মাঝি বা পদাবলীর শ্রীরাধা চরিত্রগুলিকে লেখক কেন বাঙালির নিজস্ব বলেছেন?
উত্তর: কারণ ভাটিয়ালির নৌকার মন-মাঝি বা বৈষ্ণব পদাবলীর শ্রীরাধা চরিত্রগুলো বাইরের কোনো দেশ থেকে ধার করা নয়, এগুলো একেবারে আমাদের বাংলার মাটি, প্রকৃতি ও সংস্কৃতিরই ফসল।
25. “সে ভাষার শব্দ বাংলাতে ঢুকবেই।” — কোন্ ভাষার শব্দ বাংলাতে ঢুকবে বলে লেখক মনে করেন?
উত্তর: প্রাবন্ধিকের মতে, বাংলা ভাষা ছাড়া আমরা অন্য যে-কোনো বিদেশি ভাষার চর্চাই করি না কেন, আমাদের অজান্তেই সেই ভাষার শব্দ বাংলা শব্দভাণ্ডারে অবলীলায় প্রবেশ করবেই।
নবম শ্রেণির বাংলা ‘নব নব সৃষ্টি’ প্রবন্ধের ২ নম্বর প্রশ্ন ও উত্তর | Class 9 Bengali Naba Naba Srishti 2 Marks Question Answer
1. প্রাবন্ধিকের মতে সংস্কৃত ভাষাকে কেন ‘আত্মনির্ভরশীল’ ভাষা বলা হয়?
উত্তর: নতুন কোনো চিন্তা, ধারণা বা বস্তুর নামকরণের জন্য সংস্কৃত ভাষা কখনও অন্য কোনো ভাষার ওপর নির্ভর করে না। বরং নতুন শব্দের দরকার হলে সংস্কৃত নিজের সমৃদ্ধ ধাতুভাণ্ডার থেকেই নতুন শব্দ তৈরি করে নেয়। অন্যের মুখাপেক্ষী না হওয়ার এই অনন্য গুণের জন্যই সংস্কৃতকে আত্মনির্ভরশীল ভাষা বলা হয়েছে।
2. বর্তমান যুগের ইংরেজি ও বাংলা ভাষাকে কেন ‘আত্মনির্ভরশীল’ বলা যায় না?
উত্তর: সংস্কৃতের মতো বাংলা বা ইংরেজি ভাষা নিজেদের শব্দভাণ্ডারের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল নয়। যুগের প্রয়োজনে, নতুন বৈজ্ঞানিক বা সামাজিক ধারণা প্রকাশের জন্য এই ভাষাগুলো বিদেশি ভাষা থেকে দেদার শব্দ ধার করেছে এবং এখনও অবিরত করছে। নিজেদের ভাণ্ডার খোঁজার বদলে অন্যের থেকে শব্দ ধার নেওয়ার এই প্রবণতার জন্যই এদের আত্মনির্ভরশীল বলা যায় না।
3. বিদ্যাসাগর মশাইয়ের স্বনামে ও ছদ্মনামে লেখা রচনার ভাষার মধ্যে মূল পার্থক্য কী ছিল?
উত্তর: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর যখন নিজের নামে ধ্রুপদী সাধু ভাষার প্রবন্ধ লিখতেন, তখন তিনি তাতে বিদেশি শব্দ একদমই ব্যবহার করতেন না; বিশুদ্ধতা বজায় রাখতেন। কিন্তু যখন তিনি ছদ্মনামে কোনো ‘অসাধু’ বা রম্য রচনা লিখতেন, তখন সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা ফুটিয়ে তুলতে প্রচুর আরবি-ফারসি শব্দ অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার করতেন।
4. বাংলা সাহিত্যে আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন ছিল?
উত্তর: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা ভাষায় বিদেশি শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো অযথা গোঁড়ামি দেখাননি। তিনি প্রয়োজন বুঝে নিজের লেখায় অত্যন্ত সাবলীলভাবে আরবি-ফারসি শব্দ গ্রহণ করেছেন। উদাহরণ হিসেবে প্রাবন্ধিক রবীন্দ্রনাথের রচনায় ‘আব্রু’, ‘ইজ্জত’, ‘ঈমান’-এর মতো আরবি-ফারসি শব্দের চমৎকার ও সার্থক প্রয়োগের কথা তুলে ধরেছেন।
5. ‘ইনকিলাব’ ও ‘শহিদ’ শব্দ দুটি বাংলা শব্দভাণ্ডারে কীভাবে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে?
উত্তর: বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর বিভিন্ন গণসংগীত, কবিতা ও সাহিত্যে ‘ইনকিলাব’ (বিপ্লব) এবং ‘শহিদ’ শব্দ দুটিকে এমন অসাধারণ দক্ষতায় ব্যবহার করেছেন যে, এগুলো এখন আর আমাদের কাছে বিদেশি শব্দ বলে মনেই হয় না। এগুলো যেন আপামর বাঙালির আবেগ ও দৈনন্দিন ভাষার একেবারে নিজস্ব সম্পদে পরিণত হয়েছে।
6. হিন্দি ভাষা থেকে আরবি-ফারসি শব্দ তাড়ানোর চেষ্টার ফল শেষ পর্যন্ত কেমন হয়েছে?
উত্তর: বর্তমানে বহু হিন্দি সাহিত্যিক কোমর বেঁধে নেমেছেন হিন্দি ভাষা থেকে আরবি-ফারসি শব্দকে পুরোপুরি দূর করার জন্য। কিন্তু প্রাবন্ধিকের মতে, এই চেষ্টার ফল দৃশ্যত খুব একটা ভালো হয়নি; বরং জোর করে বিদেশি শব্দ তাড়াতে গিয়ে হিন্দি ভাষার স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও সাবলীলতা নষ্ট হয়ে ভাষাটি অনেক বেশি আড়ষ্ট হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
7. বর্তমান যুগে বিজ্ঞানচর্চা বা পরিভাষা শেখার ক্ষেত্রে ইংরেজি ভাষার প্রয়োজনীয়তা কতখানি?
উত্তর: প্রাবন্ধিক সৈয়দ মুজতবা আলী মনে করেন, রেলের ইঞ্জিন থেকে শুরু করে আধুনিক পদার্থবিদ্যা বা রসায়নবিদ্যার মতো বিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলো চর্চার জন্য বাংলা পরিভাষা এখনও যথেষ্ট সমৃদ্ধ নয়। তাই প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের এই টেকনিক্যাল শব্দগুলোর জন্য আমাদের এখনও ইংরেজি ভাষার ওপরই গভীরভাবে নির্ভর করতে হয়।
8. বাংলা ভাষায় আরবি-ফারসি শব্দের ভবিষ্যৎ নিয়ে লেখক কী পূর্বাভাস দিয়েছেন?
উত্তর: লেখকের মতে, আরব বা ইরানে যদি হঠাৎ করে জ্ঞান-বিজ্ঞান বা প্রযুক্তিগত কোনো বিশাল বিপ্লব না ঘটে, তবে অদূর ভবিষ্যতে নতুন করে কোনো আরবি-ফারসি শব্দ বাংলা ভাষায় প্রবেশ করার সম্ভাবনা খুবই কম। তবে যে শব্দগুলো আগে থেকেই বাংলায় ঢুকে গেছে, সেগুলো বাংলার নিজস্ব সম্পদ হিসেবেই চিরকাল থেকে যাবে।
9. ভারতীয় বিভিন্ন ভাষার গদ্যে ফারসি ভাষার প্রভাব এত বেশি কেন?
উত্তর: প্রাচীনকাল থেকেই ভারতীয় আর্যগণ ইরানি সাহিত্য এবং ফারসি ভাষার সৌন্দর্যে মুগ্ধ ছিলেন। ফারসি ভাষার এই নান্দনিক আকর্ষণ ও মাধুর্যের কারণেই ভারতের বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষা ও গদ্যে আরবি ভাষার তুলনায় ফারসি ভাষার প্রভাব অনেক বেশি মাত্রায় চোখে পড়ে।
10. পদাবলী কীর্তনের সাহিত্যকে প্রাবন্ধিক বাঙালির ‘সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যসৃষ্টি’ বলেছেন কেন?
উত্তর: পদাবলী কীর্তনের রাধা-কৃষ্ণ মূলত পৌরাণিক চরিত্র হলেও, বৈষ্ণব পদাবলিতে তাঁরা যেন আমাদের বাংলারই ঘরের ছেলেমেয়ে হয়ে উঠেছেন। এই সাহিত্যের প্রাণ ও দেহ—দুটোতেই খাঁটি বাঙালির আবেগ, বিরহ ও সংস্কৃতি এমন নিখুঁতভাবে মিশে আছে যে, প্রাবন্ধিক একেই বাঙালির শ্রেষ্ঠ সম্পদ বা সাহিত্যসৃষ্টি বলে মনে করেছেন।
11. বাঙালির চরিত্রের মজ্জাগত ‘বিদ্রোহ’-এর স্বরূপটি লেখক কীভাবে তুলে ধরেছেন?
উত্তর: লেখক বলেছেন, বাঙালি জাতি চিরকালই নতুনকে আপন করে নিতে ভালোবাসে। যখনই তারা নতুন কোনো সত্য, সুন্দর বা মঙ্গলের খোঁজ পেয়েছে, তখনই তারা পুরনো প্রথা ও প্রাচীন রীতিনীতির মায়াজাল ছিন্ন করে তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে। এটাই হলো বাঙালির চারিত্রিক বিদ্রোহের আসল স্বরূপ।
12. বাঙালির এই চারিত্রিক বিদ্রোহ কি কেবল কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ?
উত্তর: একেবারেই নয়। প্রাবন্ধিকের মতে, বাঙালির এই চিরাচরিত বিদ্রোহী সত্তা কোনো নির্দিষ্ট হিন্দু বা মুসলমান ধর্মের গণ্ডিতে আটকে নেই। ধর্ম বদলালেও যেমন জাতির মূল চরিত্র বদলায় না, তেমনি সাহিত্য, রাজনীতি বা সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে আপামর বাঙালি সবসময়ই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সমানভাবে বিদ্রোহী।
নবম শ্রেণির বাংলা ‘নব নব সৃষ্টি’ প্রবন্ধের ৩ নম্বর প্রশ্ন ও উত্তর | Class 9 Bengali Naba Naba Srishti 3 Marks Question Answer
1. “সংস্কৃত ভাষা আত্মনির্ভরশীল”— সংস্কৃত ভাষার এই বৈশিষ্ট্যের কারণ আলোচনা করো।
উত্তর: প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর ‘নব নব সৃষ্টি’ প্রবন্ধে সংস্কৃত ভাষাকে ‘আত্মনির্ভরশীল’ বা স্বয়ংসম্পূর্ণ বলে দাবি করেছেন।
এর প্রধান কারণ হলো, সংস্কৃত ভাষার নিজস্ব শব্দ ও ধাতুর ভাণ্ডার অত্যন্ত প্রাচীন এবং ভীষণ রকম সমৃদ্ধ। কোনো নতুন বস্তু, চিন্তা বা অনুভূতিকে প্রকাশ করার জন্য যখনই কোনো নতুন শব্দের প্রয়োজন হয়, তখন সংস্কৃত ভাষা অন্য কোনো বিদেশি ভাষার কাছে ধার চাইতে যায় না। বরং সে নিজের ভাণ্ডারে থাকা কোনো পুরোনো শব্দ বা ধাতুর সামান্য অদলবদল ঘটিয়ে সহজেই নতুন একটা শব্দ তৈরি করে নেয়। সংস্কৃত ভাষা যে একদমই বিদেশি শব্দ নেয়নি, তা নয়; তবে তার পরিমাণ এতই নগণ্য যে, তাকে খুব সহজেই উপেক্ষা করে স্বয়ংসম্পূর্ণ বা আত্মনির্ভরশীল ভাষার মর্যাদা দেওয়া যায়।
2. বাংলা ভাষায় কেন এবং কীভাবে বিদেশি শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটেছে?
উত্তর: বাংলা ভাষা কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপের ভাষা নয়, বরং বিভিন্ন জাতির মিশ্রণের ফলেই এই ভাষা সমৃদ্ধ হয়েছে।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ভারতে যখন পাঠান ও মোগলরা তাদের শাসন কায়েম করল, তখন আইন-আদালত, খাজনা-খারিজ বা বিচার বিভাগের নতুন নতুন কাজের সূত্র ধরে প্রচুর আরবি ও ফারসি শব্দ সরাসরি বাংলা ভাষায় ঢুকে পড়ে। পরবর্তীকালে যখন ব্রিটিশরা ভারত শাসন করতে শুরু করল, তখন তাদের হাত ধরে এবং ইংরেজি শিক্ষার বিস্তারের মাধ্যমে প্রচুর ইংরেজি ও ইউরোপীয় শব্দ বাংলার অন্দরে নিজেদের পাকাপোক্ত জায়গা করে নেয়। এভাবেই রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, সামাজিক প্রয়োজন এবং বাণিজ্যের সূত্র ধরেই মূলত বাংলা ভাষায় বিদেশি শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটেছে।
3. “বর্তমান যুগের ইংরেজি ও বাংলা আত্মনির্ভরশীল নয়।” — ‘নব নব সৃষ্টি’ প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক কীভাবে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন?
উত্তর: প্রাবন্ধিক সৈয়দ মুজতবা আলীর মতে, প্রাচীন যুগের সংস্কৃত, হিব্রু বা গ্রিকের মতো ভাষাগুলো আত্মনির্ভরশীল হলেও বর্তমান যুগের ইংরেজি ও বাংলা ভাষা মোটেও আত্মনির্ভরশীল নয়।
এর কারণ হলো, এই ভাষাগুলো নিজেদের প্রয়োজনের সময় নিজেদের ভাণ্ডার খোঁজার বদলে অন্য ভাষার ওপর অনেক বেশি নির্ভর করে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলা ভাষায় পাঠান-মোগল যুগে প্রচুর আরবি-ফারসি শব্দ ঢুকেছে। এরপর ব্রিটিশ আমলে ইংরেজি ভাষার হাত ধরে অসংখ্য ইউরোপীয় শব্দ বাংলায় প্রবেশ করেছে এবং আধুনিক যুগে বিজ্ঞান বা প্রযুক্তির প্রয়োজনেও আমরা অবিরত বিদেশি শব্দ গ্রহণ করে চলেছি। ইংরেজি ভাষাও ঠিক একইভাবে অন্য ভাষা থেকে অঢেল শব্দ ধার করেছে। তাই ধার করার এই প্রবণতার জন্যই প্রাবন্ধিক এদের আত্মনির্ভরশীল নয় বলে মন্তব্য করেছেন।
4. “সংস্কৃত চর্চা উঠিয়ে দিলে আমরা অন্যতম প্রধান খাদ্য থেকে বঞ্চিত হব।” — লেখক এ কথা বলেছেন কেন?
উত্তর: সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর ‘নব নব সৃষ্টি’ প্রবন্ধে জানিয়েছেন যে, আমরা যে বিদেশি ভাষার চর্চা যত বেশি করি, আমাদের মাতৃভাষায় সেই ভাষার শব্দ তত বেশি প্রবেশ করে।
প্রাচীনকাল থেকেই বাংলায় সংস্কৃত ভাষার ব্যাপক চর্চা থাকার কারণেই বাংলা শব্দভাণ্ডারে বিস্তর সংস্কৃত শব্দ ঢুকেছে। বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডারকে পুষ্ট করতে এবং নতুন নতুন শব্দের জোগান দিতে সংস্কৃত ভাষার অবদান অপরিসীম। তাই লেখক মনে করেন, স্কুল-কলেজ থেকে সংস্কৃত ভাষার পঠনপাঠন বা চর্চা যদি পুরোপুরি উঠিয়ে দেওয়া হয়, তবে বাংলা ভাষা তার শব্দের প্রধান উৎস বা খাদ্যের জোগান থেকেই বঞ্চিত হবে এবং এর ফলে ভাষাটাই অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়বে।
5. বিদেশি শব্দ বর্জনকে লেখক কেন ‘অসম্ভব’ মনে করেন?
উত্তর: লেখক খুব বাস্তবসম্মত যুক্তি দিয়ে বুঝিয়েছেন যে, আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে আলু, কপি বা নানাবিধ বিদেশি পণ্য যেমন একেবারে অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে, তেমনি তাদের বিদেশি নামগুলোও বাংলা ভাষার সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। এগুলোকে আর আলাদা করা সম্ভব নয়।
তাছাড়া, আধুনিক যুগে বিজ্ঞানচর্চা, ওষুধপত্রের ব্যবহার বা টেকনিক্যাল পরিভাষার ক্ষেত্রে আমাদের বিদেশি বা ইংরেজি শব্দের ওপর নির্ভর করতেই হবে। আবার শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ইংরেজিকে সরিয়ে বাংলাকে আনলে, অনুবাদ করার প্রয়োজনে আরও বেশি করে ইউরোপীয় শব্দ বাংলায় ঢুকবে। তাই শুধু গোঁড়ামির বশে ভাষা থেকে বিদেশি শব্দ তাড়িয়ে দেওয়া বা বর্জন করাটা লেখকের কাছে একেবারেই অসম্ভব বলে মনে হয়েছে।
6. বিদ্যাসাগরের গদ্য রচনায় ভাষার বৈশিষ্ট্য আলোচনা করো।
উত্তর: বাংলা গদ্যের জনক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ভাষার ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি চমৎকার ভারসাম্য বজায় রাখতেন।
তিনি যখন নিজের নামে কোনো ধ্রুপদী বা সাধু ভাষার প্রবন্ধ লিখতেন, তখন ভাষার বিশুদ্ধতা বজায় রাখতে সংস্কৃতঘেঁষা শব্দ ব্যবহার করতেন এবং বিদেশি শব্দ খুব সচেতনভাবে এড়িয়ে চলতেন। কিন্তু সমাজ সংস্কার বা তীব্র ব্যঙ্গ করার প্রয়োজনে তিনি যখন ছদ্মনামে (যেমন- কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোস্য) কোনো ‘অসাধু’ বা রম্য রচনা লিখতেন, তখন সাধারণ মানুষের পালস বুঝতে তিনি অবলীলায় প্রচুর আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহার করতেন। এর থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, বিদ্যাসাগর মশাই ভাষা নিয়ে কোনো গোঁড়ামি করতেন না; বরং রচনার বিষয়বস্তু ও প্রয়োজনের ওপর ভিত্তি করেই তিনি ভাষা নির্বাচন করতেন।
7. ‘নব নব সৃষ্টি’ প্রবন্ধে নজরুলের ভাষার অবদান কীভাবে চিত্রিত হয়েছে?
উত্তর: বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যে আরবি-ফারসি শব্দের যে অপূর্ব ও সার্থক প্রয়োগ ঘটিয়েছেন, প্রাবন্ধিক সৈয়দ মুজতবা আলী তার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
নজরুল ইসলাম আরবি-ফারসি শব্দগুলোকে শুধু জোর করে কবিতায় ঢুকিয়ে দেননি, বরং সেগুলোকে বাংলার বিদ্রোহ, বিপ্লব ও বীরত্বের সমার্থক হিসেবে এমনভাবে ব্যবহার করেছেন যে তা আপামর বাঙালির হৃদয়ে গেঁথে গেছে। তাঁর কলমের ছোঁয়ায় ‘ইনকিলাব’ (বিপ্লব) বা ‘শহিদ’-এর মতো শব্দগুলো যেন বিদেশি খোলস ছেড়ে বাংলার নিজস্ব বুলিতে পরিণত হয়েছে। নজরুলের এই সাহসী ও জাদুকরী প্রয়োগ বাংলা ভাষাকে সত্যিই এক নতুন ঐশ্বর্যে ভরিয়ে দিয়েছে।
8. “বাঙালির চরিত্রে বিদ্রোহ বিদ্যমান।” – এ প্রসঙ্গে তোমার মত উপযুক্ত উদাহরণসহ প্রতিষ্ঠা করো।
উত্তর: প্রাবন্ধিক সৈয়দ মুজতবা আলীর এই মতের সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ একমত। বাঙালির মজ্জায় মজ্জায় যে বিদ্রোহ মিশে আছে, ইতিহাস তার সবচেয়ে বড়ো প্রমাণ।
বাঙালি জাতি যখনই রাজনীতি, ধর্ম বা সাহিত্যে নতুন কোনো সত্য বা সুন্দরের খোঁজ পেয়েছে, তখনই তারা সবরকমের সংকীর্ণতা ভুলে তাকে আপন করে নিয়েছে। আর যখনই কেউ প্রাচীন প্রথা বা অন্ধ সংস্কার তাদের ওপর জোর করে চাপিয়ে দিতে চেয়েছে, বাঙালি তার বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছে। এর সবচেয়ে জ্বলন্ত উদাহরণ হলো ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন। পূর্ব পাকিস্তানে যখন জোর করে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হলো, তখন বাঙালিরাই প্রথম মাতৃভাষার সম্মানে রক্ত দিয়ে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। বাঙালির এই আপসহীন স্বভাবই তাদের চরিত্রের মজ্জাগত বিদ্রোহের পরিচয় দেয়।
9. ‘বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যসৃষ্টি তার পদাবলি কীর্তনে।’ – এই মন্তব্যের সপক্ষে লেখকের বক্তব্য লেখো।
উত্তর: সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর ‘নব নব সৃষ্টি’ প্রবন্ধে পদাবলী কীর্তনকেই বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্য সৃষ্টি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
লেখকের মতে, পদাবলী কীর্তনের সাহিত্য হলো এমন এক অমূল্য সম্পদ, যার প্রাণ এবং দেহ—উভয় দিক থেকেই খাঁটি বাঙালির গন্ধ মিশে আছে। পদাবলী কীর্তনের মূল চরিত্র রাধা বা শ্রীকৃষ্ণ মূলত সংস্কৃত সাহিত্য বা মহাভারতের চরিত্র হলেও, পদাবলীতে তাঁরা আর বাইরের কেউ থাকেননি। সেখানে শ্রীকৃষ্ণ হয়ে উঠেছেন বাংলার আদরের ‘কানু’, আর শ্রীরাধাও হয়ে উঠেছেন বাংলারই কোনো এক ঘরের আটপৌরে ও আবেগপ্রবণ মেয়ে। বাইরের প্রভাবমুক্ত হয়ে একেবারে বাংলার নিজস্ব মাটি ও সংস্কৃতিকে আশ্রয় করে গড়ে ওঠার কারণেই লেখক একে শ্রেষ্ঠ সাহিত্য বলেছেন।
10. হিন্দি ভাষার সংকট ও আরবি-ফারসি শব্দ বিতাড়নের চেষ্টা সম্পর্কে লেখকের মন্তব্য কী?
উত্তর: হিন্দি ভাষা থেকে জোর করে আরবি-ফারসি শব্দ তাড়িয়ে দেওয়ার যে চেষ্টা বর্তমানে চলছে, প্রাবন্ধিক তাকে একটি গভীর সংকট বা নেতিবাচক দিক হিসেবেই দেখেছেন।
লেখক জানিয়েছেন, বর্তমানে একদল গোঁড়া সাহিত্যিক কোমর বেঁধে নেমেছেন হিন্দি ভাষা থেকে বিদেশি শব্দ ছেঁটে ফেলার জন্য। কিন্তু লেখক মনে করেন, মুন্সী প্রেমচন্দের মতো প্রথিতযশা সাহিত্যিকরা তাঁদের লেখায় যেসব ফারসি-আরবি শব্দের চমৎকার প্রয়োগ করে গেছেন, তাকে জোর করে সরানো হলে হিন্দি ভাষা তার স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও সাবলীলতা হারাবে। ভাষার এই স্বাভাবিক গতিকে জোর করে বাধা দেওয়ার ফল শেষ পর্যন্ত আদৌ ইতিবাচক হবে কি না, তা নিয়ে লেখকের মনে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।
1. ‘নব নব সৃষ্টি’ প্রবন্ধে অনুসারী সংস্কৃত ভাষার সাথে ইংরেজি ও বাংলা ভাষার পার্থক্যের যে বিবরণ লেখক দিয়েছেন, তা বর্ণনা করো।
উত্তর: সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর ‘নব নব সৃষ্টি’ প্রবন্ধে ভাষার স্বনির্ভরতার বিষয়টি তুলে ধরতে গিয়ে সংস্কৃত ভাষার সঙ্গে বাংলা ও ইংরেজি ভাষার চমৎকার তুলনা করেছেন।
প্রাবন্ধিকের মতে, সংস্কৃত হলো একটি ‘আত্মনির্ভরশীল’ বা স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাষা। যখনই কোনো নতুন ভাব, চিন্তা বা বস্তুর নামকরণের প্রয়োজন পড়ে, সংস্কৃত ভাষা অন্য কোনো বিদেশি ভাষার কাছে হাত পাতে না। বরং সে নিজের বিশাল ধাতুভাণ্ডার ঘেঁটে সামান্য অদলবদল করে নতুন শব্দ তৈরি করে নেয়।
অন্যদিকে, ইংরেজি ও বাংলা ভাষাকে লেখক পরনির্ভরশীল বলেছেন। কারণ, এই দুই ভাষা যুগের প্রয়োজনে বা অকারণে ভিনদেশি ভাষা থেকে দেদার শব্দ ধার করেছে। যেমন, পাঠান-মোগল যুগে আরবি-ফারসি এবং ব্রিটিশ আমলে প্রচুর ইংরেজি শব্দ সরাসরি বাংলায় ঢুকেছে। ইংরেজির অবস্থাও অনেকটা খবরের কাগজের মতো, যেখানে দুনিয়ার নানা প্রান্তের শব্দ এসে ভিড় করে। অন্য ভাষা থেকে শব্দ গ্রহণের এই অসীম ক্ষমতার ওপরই আসলে বাংলা ও ইংরেজির প্রাণশক্তি টিকে আছে।
2. “বিদেশি শব্দ নেওয়া ভালো না মন্দ সে প্রশ্ন অবান্তর”— লেখকের এই যুক্তির স্বপক্ষে প্রবন্ধ অবলম্বনে আলোচনা করো।
উত্তর: প্রাবন্ধিক সৈয়দ মুজতবা আলীর মতে, বাংলা ভাষায় বিদেশি শব্দ গ্রহণ করা উচিত কি অনুচিত—এই নিয়ে তর্ক করাটা এখন একেবারেই অর্থহীন বা অবান্তর।
এর সপক্ষে তিনি অকাট্য যুক্তি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে আলু, কপি বা বিলিতি ওষুধের মতো বিদেশি জিনিসগুলো যেমন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে, ঠিক তেমনি ভাষার ক্ষেত্রেও বিদেশি শব্দগুলো আমাদের জীবনের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে চাইলেও সেগুলোকে আর ছেঁটে ফেলা সম্ভব নয়। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মতো চরম নিষ্ঠাবান পণ্ডিতও তাঁর সাধারণ বা ‘অসাধু’ রচনায় সাবলীলভাবে বিদেশি শব্দ ব্যবহার করেছেন। আবার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা কাজী নজরুল ইসলামের মতো সাহিত্যিকরা অত্যন্ত সার্থকভাবে আরবি-ফারসি শব্দকে বাংলা সাহিত্যের নিজস্ব সম্পদে পরিণত করেছেন। তাই অকারণে গোঁড়ামি না করে, ভাষার স্বাভাবিক গতিরূপ আর দৈনন্দিন প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে বিদেশি শব্দকে আপন করে নেওয়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
3. বাঙালির চরিত্রে ও সাহিত্যে যে বিদ্রোহের পরিচয় ফুটে উঠেছে, তা ‘নব নব সৃষ্টি’ প্রবন্ধ অনুযায়ী লেখো।
উত্তর: প্রাবন্ধিক সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর ‘নব নব সৃষ্টি’ প্রবন্ধে বাঙালির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের এক অনন্য দিক তুলে ধরেছেন, আর তা হলো—বিদ্রোহ। বাঙালির এই বিদ্রোহ কোনো ধ্বংসাত্মক কাজ নয়, বরং নতুনের আবাহন।
লেখক বলেছেন, রাজনীতি, ধর্ম এবং সাহিত্য—এই তিনটি প্রধান ক্ষেত্রে বাঙালি চিরকাল নিজের সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য গতানুগতিকতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে। যখনই কোনো পুরোনো নিয়ম, জীর্ণ প্রথা বা সংকীর্ণতা বাঙালির মানসিক বিকাশকে আটকে দিতে চেয়েছে, তখনই বাঙালি তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। আর এই বিদ্রোহ কেবল হিন্দু বা মুসলমান—কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের গণ্ডিতে আটকে থাকেনি; এটি আপামর বাঙালির রক্তে মিশে থাকা এক স্বভাব। পদাবলী কীর্তনের মতো কালজয়ী সাহিত্য এই বিদ্রোহী সত্তারই ফসল, যেখানে পৌরাণিক রাধা-কৃষ্ণ বাইরের আবরণ ছেড়ে বাঙালির একেবারে নিজস্ব ও অকৃত্রিম আবেগের প্রতীকে পরিণত হয়েছেন।
4. বর্তমান বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার পরিপ্রেক্ষিতে ইংরেজি ভাষার প্রয়োজনীয়তা প্রবন্ধে লেখক কীভাবে বিশ্লেষণ করেছেন?
উত্তর: বর্তমান যুগে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির কথা মাথায় রেখে প্রাবন্ধিক সৈয়দ মুজতবা আলী অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, আমাদের দেশ থেকে ইংরেজি ভাষার চর্চা এখনই পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়াটা একেবারেই বাস্তবসম্মত নয়।
এর মূল কারণ হিসেবে লেখক দেখিয়েছেন যে, রসায়নবিদ্যা, পদার্থবিদ্যা, চিকিৎসাবিজ্ঞান বা জটিল যন্ত্রপাতির কারিগরি বিষয়ের জন্য যে ধরনের উচ্চমানের টেকনিক্যাল পরিভাষা বা বইপত্র দরকার, বাংলা ভাষায় তা এখনও সেভাবে তৈরি হয়ে ওঠেনি। উদাহরণস্বরূপ, একটি রেলের ইঞ্জিন কীভাবে চালাতে হয়, তার যথাযথ বৈজ্ঞানিক পরিভাষা বাংলায় পাওয়া কঠিন। তাই আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে আমাদের ইংরেজি ভাষার ওপর নির্ভর করতেই হবে। বাংলা ভাষা সাহিত্য ও দর্শনে যতই উন্নত হোক না কেন, বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি শিক্ষার অভাব মেটাতে ইংরেজি চর্চা অপরিহার্য।
5. ‘নব নব সৃষ্টি’ প্রবন্ধে লেখক বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের ভাষা ব্যবহারের যে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দেখিয়েছেন, তা আলোচনা করো।
উত্তর: ‘নব নব সৃষ্টি’ প্রবন্ধে সৈয়দ মুজতবা আলী বাংলা সাহিত্যের তিন দিকপালের ভাষা ব্যবহারের এক তুলনামূলক ও চমৎকার চিত্র তুলে ধরেছেন।
পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তাঁর সাধু ভাষার রচনায় চরম বিশুদ্ধতা বজায় রাখতেন, সেখানে বিদেশি শব্দের প্রবেশাধিকার ছিল না। কিন্তু ছদ্মনামে লেখা ব্যঙ্গ বা সমাজ সংস্কারমূলক রচনায় তিনি সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা ফুটিয়ে তুলতে অবলীলায় আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহার করেছেন। অন্যদিকে, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভাষা নিয়ে কোনো গোঁড়ামি করেননি। তিনি অত্যন্ত সাবলীলভাবে ‘আব্রু’, ‘ইজ্জত’-এর মতো আরবি-ফারসি শব্দ বাংলা গদ্যে মিশিয়েছেন। আর কাজী নজরুল ইসলামের অবদান এ ক্ষেত্রে আরও একধাপ এগিয়ে। তিনি ‘ইনকিলাব’ বা ‘শহিদ’-এর মতো শব্দগুলোকে কেবল ব্যবহারই করেননি, সেগুলোকে বাঙালির রক্তগরম করা বিদ্রোহ ও বীরত্বের প্রতীকে পরিণত করেছেন। এই তিন মহারথীর হাত ধরেই বিদেশি শব্দগুলো বাংলা ভাষার নিজস্ব ঐশ্বর্যে পরিণত হয়েছে।
6. “ধর্ম বদলালেই জাতির চরিত্র বদলায় না”— উক্তিটির আলোকে বাঙালির জাতিগত বৈচিত্র্য ও বৈশিষ্ট্যের ওপর আলোকপাত করো।
উত্তর: সৈয়দ মুজতবা আলী আলোচ্য উক্তিটির মাধ্যমে বাঙালির জাতিগত ঐক্য এবং শেকড়ের চিরন্তন রূপটিকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তাঁর মতে, বাঙালির সাংস্কৃতিক ও চারিত্রিক কাঠামোর ভিত্তি ধর্মের চেয়েও অনেক বেশি গভীর।
লেখক বলতে চেয়েছেন, একজন বাঙালি হিন্দু হোক বা মুসলমান, তাদের নাড়ির টান এবং আদি বংশপরম্পরা একই মাটির সঙ্গে যুক্ত। ধর্মাচরণ বা উপাসনার পদ্ধতি আলাদা হতে পারে, কিন্তু বাঙালির রক্তে যে বিদ্রোহ, নতুনের প্রতি টান আর প্রথাবিরোধী মনোভাব মিশে আছে—তা কোনোভাবেই আলাদা নয়। যখনই কোনো অন্যায় বা কুসংস্কার বাঙালির ওপর চেপে বসেছে, হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে আপামর বাঙালি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে। ধর্ম পরিবর্তন করলেও মানুষের জাতিগত স্বভাব বা মজ্জাগত বৈশিষ্ট্য যে কখনো মুছে যায় না, প্রাবন্ধিক এই চিরন্তন সত্যটিকেই তুলে ধরেছেন।
7. ‘নব নব সৃষ্টি’ প্রবন্ধটির নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।
উত্তর: সাহিত্যের ক্ষেত্রে নামকরণ হলো বিষয়বস্তুর আয়না। সৈয়দ মুজতবা আলীর লেখা ‘নব নব সৃষ্টি’ প্রবন্ধটির নামকরণও এর মূল বক্তব্যের সঙ্গে একেবারে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে।
প্রবন্ধটিতে লেখক দেখিয়েছেন, ভাষা কীভাবে স্থবিরতা কাটিয়ে যুগের প্রয়োজনে বারবার নতুন রূপ ধারণ করে। সংস্কৃত ভাষার নিজের ভাণ্ডার থেকে নতুন শব্দ তৈরি করা থেকে শুরু করে বাংলা ভাষার অবিরত বিদেশি শব্দ গ্রহণ—সবটাই আসলে ভাষার নব নব সৃষ্টির এক একটা পর্যায়। শুধু ভাষা নয়, লেখক এখানে বাঙালির বিদ্রোহী চরিত্রের কথাও বলেছেন, যে বিদ্রোহ আসলে পুরোনোকে ভেঙে নতুন কিছু গড়ার বা সৃষ্টিরই নামান্তর। পদাবলী কীর্তনের খাঁটি বাঙালিয়ানা থেকে শুরু করে নজরুলের হাতে বিদেশি শব্দের নতুন জীবন পাওয়া—পুরো প্রবন্ধ জুড়েই রয়েছে নতুনত্বকে বরণ করে নেওয়ার উৎসব। তাই বিষয়বস্তুর গভীরতা আর মূল সুরের সঙ্গে মিল রেখে ‘নব নব সৃষ্টি’ নামকরণটি পুরোপুরি সার্থক ও তাৎপর্যপূর্ণ হয়েছে।
8. “ফল যদি ভাল হয় তখন তারা না হয় চেষ্টা করে দেখবেন”— কী চেষ্টা করে দেখার কথা এখানে বলা হয়েছে? এ বিষয়ে বাঙালি সাহিত্যিকদের ভূমিকা কী ছিল?
উত্তর: প্রাবন্ধিক সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘নব নব সৃষ্টি’ প্রবন্ধে বর্তমানে কিছু গোঁড়া হিন্দি সাহিত্যিকদের বিদেশি শব্দ বর্জনের যে প্রবণতা, এখানে সেই ‘চেষ্টা’র কথাই বলা হয়েছে। তাঁরা চাইছেন হিন্দি ভাষা থেকে আরবি, ফারসি ও ইংরেজি শব্দ পুরোপুরি তাড়িয়ে দিয়ে ভাষাকে আত্মনির্ভরশীল করতে। লেখক বলেছেন, তাঁদের এই শুদ্ধিকরণের চেষ্টা যদি সফল হয়, তখন অন্য ভাষার মানুষরা হয়তো ভেবে দেখবেন।
এ বিষয়ে বাঙালি সাহিত্যিকদের ভূমিকা বরাবরই খুব স্পষ্ট এবং উদার ছিল। বাঙালি সাহিত্যিকরা জানতেন যে, আধুনিক বিজ্ঞান বা নতুন চিন্তা প্রকাশের জন্য বিদেশি শব্দের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। তাই তাঁরা ভাষা নিয়ে অকারণে ছুৎমার্গ বা গোঁড়ামি দেখাননি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম বা বিদ্যাসাগরের মতো দিকপাল সাহিত্যিকরা অত্যন্ত সাবলীলভাবে বিদেশি শব্দকে বাংলা সাহিত্যের কাজে লাগিয়েছেন। প্রাবন্ধিকের মতে, ভাষার মূল উদ্দেশ্য হলো ভাবের সার্থক প্রকাশ; তাই রচনার সঙ্গে মানানসই হলে বিদেশি শব্দ গ্রহণ করতে বাঙালি সাহিত্যিকরা কখনোই পিছপা হননি।